জনগণের ক্ষোভ বুঝতে ব্যর্থ ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর হাত কামড়াচ্ছে তৃণমূল – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
আমজনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অভাব-অভিযোগ সরাসরি খতিয়ে দেখে দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে চালু হয়েছিল ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইন। কিন্তু প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং উদাসীনতায় শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। যার খেসারত দিতে হলো সাম্প্রতিক নির্বাচনে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর ভোটকুশলী সংস্থা ‘আইপ্যাক’-এর পরামর্শে শুরু হওয়া ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শাসকদলকে ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। ২০২৩ সালের মে মাসে সেই ধাঁচেই প্রশাসনিক স্তরে চালু হয় ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’। তবে পেশাদার সংস্থার বদলে এর রাশ আমলাদের হাতে যাওয়ায় কার্যক্ষেত্রে এটি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে আজ আক্ষেপ করতে হচ্ছে তৃণমূল নেতৃত্বকে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রচারের অভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলের একাংশের মতে, ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচির দায়িত্বে ছিলেন পেশাদার কর্মীরা, যাঁরা প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখতেন। কিন্তু ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’র দায়িত্ব সরকারি আধিকারিকদের হাতে যাওয়ার পর থেকেই পরিষেবার মান কমতে শুরু করে। অভিযোগ উঠেছে, হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করলে বেশির ভাগ সময়ই তা বেজে যেত, কেউ ধরত না। কখনো ফোন ধরলেও মিলত কেবলই ফাঁকা আশ্বাস। পাশাপাশি, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতাদের ব্যর্থতায় এই জনহিতকর প্রকল্পের উপযুক্ত প্রচারও করা হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে এই হেল্পলাইনের কথা ভুলেই যান এবং প্রশাসনের কাছেও এর গুরুত্ব হ্রাস পায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন কমায় শাসক শিবিরে যে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল, তা এই প্রকল্পকে আরও বেশি অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
জনক্ষোভের ইঙ্গিত এড়ানোর মাশুল
তৃণমূলের অন্দরের খবর, খোদ ভবানীপুর কেন্দ্রে প্রোমোটিং সংক্রান্ত সমস্যা থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতাদের দাপট, তোলাবাজি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ও পানীয় জলের সমস্যা নিয়ে বহু ফোন এসেছিল এই হেল্পলাইনে। এমনকি জঙ্গলমহলের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও দক্ষিণবঙ্গের এক জেলা সভাধিপতির বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক গুরুতর অভিযোগের কথা শীর্ষ নেতৃত্বের কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই দেওয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে দক্ষিণবঙ্গের আলুবলয়ে। পূর্ব বর্ধমান, হুগলি বা পশ্চিম মেদিনীপুরের আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা বিপণন সংক্রান্ত সরকারি ভুল নীতির বিরুদ্ধে হেল্পলাইনে সরব হলেও প্রশাসন তা আমল দেয়নি। ফলে ক্ষোভের আঁচ বুঝতে না পারায় দক্ষিণবঙ্গের শক্তিশালী দলীয় ঘাঁটিগুলি হাতছাড়া হয়েছে।
যদিও দলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো কেউ কেউ এই ব্যর্থতার তত্ত্ব মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহু মানুষ উপকৃত হয়েছেন এবং এবারের ভোটের ফল মূলত ধর্মীয় উন্মাদনার কারণেই প্রভাবিত হয়েছে। তবে দলের বড় অংশই এখন মনে করছে, হেল্পলাইনটি যদি সঠিকভাবে কাজ করত এবং মানুষের ক্ষোভের সঠিক পূর্বাভাস মিলত, তবে নির্বাচনী বিপর্যয় অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
