মধ্যাহ্নভোজ সেরে ঠান্ডা মাথায় গণহত্যা, পহেলগাঁও হামলায় এনআইএর চার্জশিটে শিউরে ওঠার মতো তথ্য – এবেলা

মধ্যাহ্নভোজ সেরে ঠান্ডা মাথায় গণহত্যা, পহেলগাঁও হামলায় এনআইএর চার্জশিটে শিউরে ওঠার মতো তথ্য – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ উপত্যকায় পর্যটকদের ওপর হওয়া নৃশংস জঙ্গি হামলার স্মৃতি এখনও দেশবাসীর মনে দগদগে। সম্প্রতি এই হামলার তদন্তে নেমে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) আদালতে একটি ১৫৯৭ পাতার চাঞ্চল্যকর চার্জশিট জমা দিয়েছে। আর তাতেই উঠে এসেছে লস্কর-ই-তৈবা এবং দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ)-এর মতো পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীর সেই ভয়াবহ ও ঠান্ডা মাথার ব্লুপ্রিন্ট, যা শুনলে শিউরে উঠতে হয়।

পরিকল্পিত ছক ও স্থানীয় মদত

এনআইএ-র চার্জশিট অনুযায়ী, হামলার আগের দিন অর্থাৎ ২১ এপ্রিল বিকেল ৫টা নাগাদ ফইজল জাট ওরফে সুলেমান শাহ, হাবিব তাহির ওরফে জিবরান এবং হামজা আফগানি নামের তিন পাকিস্তানি জঙ্গি কাশ্মীরের স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ আহমেদের কুঁড়েঘরে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার অজুহাতে তারা সেখানে জল ও রাতের আশ্রয় চায়। পারভেজ ও তাঁর মামা জোথার নামের দুই স্থানীয় বাসিন্দা এই জঙ্গিদের লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করেছিলেন, যাঁদের পরবর্তীকালে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় সংস্থা।

গাছের নীচে লাঞ্চ ও খুনের মহড়া

২২ এপ্রিল বৈসরণ উপত্যকার পার্কে চূড়ান্ত তাণ্ডব চালানোর আগে তিন জঙ্গি একেবারে স্বাভাবিক পর্যটকদের মতোই আচরণ করছিল। তারা একটি গাছের নীচে বসে শান্তিতে মধ্যাহ্নভোজ সারে। এরপর নিজেদের সঙ্গে থাকা অত্যাধুনিক অস্ত্র লুকাতে গায়ে কম্বল জড়িয়ে নেয়। বাকি পর্যটকদের ভিড়ে মিশে গিয়ে দুই জঙ্গি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে পুরো এলাকার গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকে এবং হামলার নিখুঁত ছক কষে। নৃশংসতার নজির গড়তে এক জঙ্গির মাথায় হেলমেটের সঙ্গে লাগানো ছিল ‘গোপ্রো’ অ্যাকশন ক্যামেরা, যাতে পুরো হত্যালীলা রেকর্ড করা যায়।

‘কিল জ়োন’ তৈরি ও বেছে বেছে হত্যা

পার্কের মূল গেট এবং জিপলাইনের চারপাশ এমনভাবে ঘিরে ফেলা হয়েছিল যাতে কেউ অবরুদ্ধ সেই ‘কিল জ়োন’ থেকে পালাতে না পারে। দুপুর ২টো ২৩ মিনিটে প্রথম গুলি চলে এম-৪ কার্বাইন রাইফেল থেকে। মুহূর্তের মধ্যে বাকি দুই জঙ্গি একে-৪৭ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে খাবারের স্টল ও পাহাড়ের ঢালে থাকা পর্যটকদের ওপর।

চার্জশিটের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, জঙ্গিরা পর্যটকদের ধরে ধরে ধর্মীয় ‘কলমা’ জিজ্ঞাসা করছিল। যারা তা বলতে পারেনি, তাদের বেছে বেছে অত্যন্ত কাছ থেকে (পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ) গুলি করে হত্যা করা হয়। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারান সইদ আদিল হুসেন শাহ নামের এক স্থানীয় ঘোড়াচালকও। পার্কের ভেতরে ২৫ জন পর্যটকসহ মোট ২৬ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে উল্লাসে শূন্যে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায় তারা।

তৎপরতা ও নেপথ্য প্রভাব

এই কাপুরুষোচিত হামলার পর উপত্যকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পর্যটন শিল্পে বড়সড় ধাক্কা লেগেছিল। তবে ভারতীয় সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এর জবাব দেয়। গত ২৯ জুলাই ‘অপারেশন মহাদেব’-এর অধীনে শ্রীনগরের অদূরে জঙ্গল ঘেরাও করে এই হামলার মূল অভিযুক্ত তিন পাকিস্তানি জঙ্গিকে খতম করা হয়। পাশাপাশি পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনা করে দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। এনআইএ-র এই চার্জশিট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সীমান্তপারের জঙ্গি সংগঠনগুলি উপত্যকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে এবং পর্যটনকে টার্গেট করতেই এই সুপরিকল্পিত হামলা চালিয়েছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *