‘BJP কোনো ধর্মশালা নয়!’ TMC ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে গেরুয়া শিবিরের বড় ধর্মসংকট – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
বিজেপি কোনো ধর্মশালা নয়: তৃণমূলে বিরাট ভাঙনের জল্পনা, কেন ‘ধর্মসংকটে’ পদ্ম শিবির?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসন নিয়ে ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় জয়ের পর রাজ্য রাজনীতিতে এখন একচ্ছত্র আধিপত্য ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP)। কিন্তু এই বিপুল সাফল্যের পর পরই গেরুয়া শিবিরের সামনে তৈরি হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই দলবদল করতে মরিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) নেতাদের পদ্ম শিবিরে নেওয়া হবে কি না— তা নিয়ে বিজেপির অন্দরে তৈরি হয়েছে এক বড় ‘ধর্মসংকট’।
তৃণমূলের এই সম্ভাব্য ভাঙন এবং বিজেপির দ্বিধাদ্বন্দ্বের মূল কারণগুলি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. বিজেপির ‘ধর্মসংকট’: কর্মীদের ক্ষোভ বনাম রাজনৈতিক আধিপত্য
বিজেপি নেতৃত্বের সামনে এখন দু’টি বিপরীতমুখী রাস্তা খোলা রয়েছে, যার যেকোনো একটি বেছে নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ:
- তৃণমূলের জন্য দরজা খুললে: যদি বিজেপি তৃণমূলের দলবদলুদের দলে জায়গা দেয়, তবে সেইসব আদি ও তৃণমূল স্তরের বিজেপি কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হবে, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মার খেয়েছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন এবং লড়াই করেছেন।
- তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করলে: যদি বিজেপি এদের ফিরিয়ে দেয়, তবে রাজ্য রাজনীতি ও জনমানসে তৃণমূলের যেটুকু অবশিষ্ট প্রভাব রয়েছে, তা সম্পূর্ণ মুছে ফেলে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে।
২. “বিজেপি কোনো ধর্মশালা নয়” — রাজ্য সভাপতির কড়া অবস্থান
দলবদলুদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য ইতিমধ্যেই অত্যন্ত কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন:
“বিজেপি কোনো ধর্মশালা নয়। যেসব তৃণমূল নেতা বিজেপি কর্মীদের হত্যা করেছেন বা তাঁদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন, তাঁদের দলে কোনো জায়গা দেওয়া হবে না।”
তাঁর যুক্তি, বাংলার মানুষ তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট রায় দিয়েছেন। এখন যদি সেই দলের নেতাদেরই বিজেপিতে নেওয়া হয়, তবে তা হবে জনগণের রায় এবং দলীয় কর্মীদের আত্মত্যাগের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
৩. রাজ্যসভার ১০ জন সাংসদের মধ্যে ৮ জনই লাইনে?
দিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক অলিন্দে জোর গুঞ্জন, নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেস এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে।
- সংসদে তৃণমূলের লোকসভায় ২৯ জন এবং রাজ্যসভায় ১০ জন সাংসদ রয়েছেন।
- বিশেষ সূত্রে খবর, ১০ জন রাজ্যসভা সাংসদের মধ্যে ৮ জনই বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে দিল্লির আম আদমি পার্টির (AAP) সাম্প্রতিক ঘটনার সাথে তুলনা করছেন, যেখানে আপ-এর ৭ জন রাজ্যসভা সাংসদ দলবদল করে শাসক শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। এছাড়া, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI/ED) ও আইনি ব্যবস্থা থেকে বাঁচতেও অনেক তৃণমূল নেতা এখন বিজেপির শরণাপন্ন হতে চাইছেন।
৪. পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা
রাজ্য নেতৃত্ব যতই এর বিরোধিতা করুক না কেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছর রাজ্যে পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচন রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় শক্তপোক্ত সংগঠন তৈরি এবং ভোট পরিচালনার জন্য তৃণমূলের এই নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও বুথ স্তরের নেটওয়ার্ক বিজেপির কাজে লাগতে পারে। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে তাড়াহুড়ো না করে ‘ধীরে চলো’ (Wait and Watch) নীতি অবলম্বন করছে।
৫. ব্যাকফুটে মমতা, ফ্রন্টফুটে শুভেন্দু
নিজের একসময়ের ‘নিরাপদ’ আসন ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় তৃণমূলের অন্দরে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শুভেন্দুর আক্রমণাত্মক প্রচারের ওপর ভর করেই বিজেপি আজ নবান্নে।
অন্যদিকে, দল ধরে রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কর্মীদের আশ্বাস দিয়ে বলেছেন যে তিনি নতুন করে দল গড়বেন, প্রয়োজনে নিজেই দলীয় কার্যালয়গুলিতে চুনকাম করবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূলের বহু বিধায়ক ও প্রবীণ নেতা ইতিমধ্যেই দলীয় বৈঠক থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন।
এক ঝলকে
- নির্বাচনের পর তৃণমূলে বিরাট ভাঙনের ইঙ্গিত; ১০ জনের মধ্যে ৮ জন রাজ্যসভা সাংসদ বিজেপিতে যাওয়ার জল্পনা।
- “বিজেপি কোনো ধর্মশালা নয়”, অত্যাচারী তৃণমূল নেতাদের নেওয়া হবে না বলে সাফ জানালেন শমিক ভট্টাচার্য।
- আদি কর্মীদের ক্ষোভ সামলানো এবং আগামী বছরের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সমীকরণ মেলানোই এখন বিজেপির মূল ধর্মসংকট।
- আইনি ব্যবস্থার ভয় এবং ভবানীপুরে মমতার পরাজয় তৃণমূলের ভেতরের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
