লেটেস্ট নিউজ

খড়্গপুরে ফের গণপিটুনির আতঙ্ক, চোর সন্দেহে যুবককে খুঁটিতে বেঁধে নৃশংস অত্যাচার – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর

দক্ষিণবঙ্গে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর ‘মব-কালচার’। বীরভূম বা বারাসাতের ছায়া এবার খড়্গপুরে। স্রেফ গুজবের বশবর্তী হয়ে এক নিরপরাধ যুবককে চোর সন্দেহে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে বেধড়ক মারধরের ঘটনায় মঙ্গলবার রণক্ষেত্রের চেহারা নিল খড়্গপুর লোকাল থানার পাঁচগেড়িয়া এলাকা। এই ঘটনায় জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এবং জনমানসে তৈরি হয়েছে গভীর আতঙ্ক।

ঘটনার সূত্রপাত ও নারকীয় অত্যাচার

আক্রান্ত যুবকের নাম সুশান্ত বর্মন, যিনি সবং থানার বিষ্ণুপুর পঞ্চায়েতের দক্ষিণবাদ এলাকার বাসিন্দা। পেশায় তিনি বিভিন্ন মোবাইল টাওয়ারে তেল সরবরাহের কাজ করেন। সোমবার বিকেলে নিজের নিত্যনৈমিত্তিক কাজেই মদনমোহনচক এলাকায় একটি টাওয়ারে তেল দিতে গিয়েছিলেন তিনি। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও সুশান্তবাবু বাড়ি না ফেরায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে পরিবারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাঁর বাইকটি টাওয়ারের সামনে পড়ে থাকলেও চালকের হদিশ নেই।

পরবর্তীতে জানা যায়, কোনো অজ্ঞাত কারণে সুশান্তবাবু বাড়বেটিয়া-জামান রোডের পাঁচগেড়িয়া গ্রামে ঢুকে পড়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত একদল উত্তেজিত জনতা তাঁকে দেখা মাত্রই ‘চোর’ বলে চিৎকার শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে জড়ো হওয়া উন্মত্ত জনতা কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই তাঁকে একটি বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে ফেলে। শুরু হয় অমানবিক মারধর। লাঠি, রড ও কিল-চড়-ঘুষিতে রক্তাক্ত হন ওই যুবক।

পুলিশি তৎপরতা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

খবর পাওয়া মাত্রই সবংয়ের বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া জেলা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খড়্গপুর লোকাল থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুশান্তবাবুকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। জখম যুবকের বাবা ঝঙ্কার বর্মন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার ছেলে নির্দোষ। স্রেফ সন্দেহের বশে ওকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। পুলিশ সঠিক সময়ে না পৌঁছালে আজ হয়তো ওকে আর ফিরে পেতাম না।”

মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও নিন্দনীয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। আমি পুলিশকে বলেছি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নিতে।” পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্য়েই শ্রীকান্ত মিশ্র ও শ্রীমন্ত মিশ্র নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।

জেলায় জেলায় গুজবের আতঙ্ক ও অবরোধ

মেদিনীপুর জেলাজুড়ে গত কয়েকদিনে গুজবের জেরে গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছুদিন আগেই এই জেলায় গুজবের বলি হতে হয়েছিল এক ইঞ্জিনিয়ারকে। এছাড়া কেশপুরে দুই রাজমিস্ত্রিকে মারধরের ঘটনাও মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সন্ধ্যার পর অচেনা এলাকায় যেতে বা বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

এদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর অভিযোগে কেশপুর থানার পুলিশ এক যুবককে আটক করলে মঙ্গলবার দুপুরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তার অভিযোগ তুলে কেশপুরের বারো মাইলে প্রায় এক ঘণ্টা রাজ্য সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর ফলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে পুলিশের দাবি, ওই যুবক এলাকায় অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছিল, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের কড়া বার্তা

জেলা পুলিশ সুপার পলাশচন্দ্র ঢালি সাফ জানিয়েছেন, “গুজব ছড়িয়ে যারা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে, তাদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না। প্রতিটি ব্লকে পুলিশি প্রচার চালানো হচ্ছে যাতে মানুষ কোনো গুজবে কান না দেয়।” তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসের পরেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে, কবে বন্ধ হবে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *