‘জ্যোতি বসু গুন্ডা বলেছিলেন, বুদ্ধদেব অহংকারী’, শোভনদেবের বিস্ফোরক স্মৃতিচারণ – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
বাংলার রাজনীতির আঙিনায় তিনি এক ‘ভদ্রলোক’ বক্সার। বয়স আশির কোঠা পেরোলেও রাজনীতির রিংয়ে তাঁর ‘আপার কাট’ এখনও অব্যর্থ। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রবীণ মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। মঙ্গলবার বিধানসভার লবিতে দাঁড়িয়ে স্মৃতির ঝাঁপি উজাড় করে দিলেন তিনি। উঠে এল জ্যোতি বসুর দেওয়া ‘গুন্ডা’ অপবাদ থেকে শুরু করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ‘অহংকার’ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সততা’ নিয়ে একগুচ্ছ অজানা কাহিনী।
জ্যোতি বসুর ঘরে সেই উত্তাল মুহূর্ত
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, একবার সুব্রত মুখোপাধ্যায় ও সৌগত রায়ের সঙ্গে মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁকে দেখেই জ্যোতি বসু সটান সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, “এই গুন্ডাটাকে কেন নিয়ে এসেছেন?” সেই দিনের কথা মনে করে হাসিমুখে শোভনদেব বলেন, “আমি সেদিনই বলেছিলাম, আমি গুন্ডা নই। তবে মানুষের কাজে বাধা দিলে গুন্ডামি করব।” আসলে বারুইপুরের চাষিদের জলের দাবিতে বিডিও অফিসে টেবিল চাপড়ানো এবং প্রতিবাদী মেজাজের কারণেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর খাতায় তাঁর নাম ‘গুন্ডা’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল।
বুদ্ধদেব ও মমতাকে নিয়ে সোজাসাপ্টা মন্তব্য
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন বেশ কড়া। শোভনদেববাবুর মতে, “তাঁকে খুব বেশি দেখিনি, তবে যেটুকু দেখেছি তাতে কিছুটা অহংকারী বলেই মনে হয়েছে।” অন্যদিকে, নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অবিচল। তৃণমূলের জন্মলগ্নের সেই নাটকীয় মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, ১৯৯৮ সালে মমতা তাঁকে হঠাৎই পদত্যাগ করতে বলেন। কেন? কারণ তাঁকে তৃণমূলের প্রতীকে লড়তে হবে। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগটুকুও দেননি নেত্রী। শোভনদেবের ভাষায়, “মমতার মতো লড়াকু এবং সৎ মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন চলে না।”
বক্সিংয়ের বিজ্ঞান ও রাজনীতির ময়দান
যৌবনে বক্সিং রিং কাঁপানো এই রাজনীতিক আজও মনে করেন, রাজনীতির লড়াই আর বক্সিংয়ের রিং—দুটোরই সায়েন্স বা বিজ্ঞান প্রায় একই। তাঁর কথায়, “একটা পা সবসময় পিছনে রাখতে হয়, না হলে প্রতিপক্ষের ঘুষিতে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।” রাজনীতিতেও সেই ভারসাম্য বজায় রেখেই তিনি ১৯৯১ সালে বাম দুর্গ বারুইপুরে ‘জায়ান্ট কিলার’ হয়েছিলেন।
দলের অনুগত সৈনিক
২০১১ সালে পরিবর্তন এলেও শুরুতে মন্ত্রী হননি তিনি, হয়েছিলেন চিফ হুইপ। ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ দপ্তরের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর কাজে মমতা এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে বলেছিলেন, “পাঁচ বছর কীভাবে সামলালেন বুঝতেই পারলাম না!” বর্তমানে কৃষিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গ আজ ধান, পাট ও সবজি উৎপাদনে দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে।
প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির বাগ্মিতা থেকে শুরু করে সিঙ্গুর আন্দোলনের সেই গান— ‘মাগো ভাবনা কেন’—সব মিলিয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের এই খোলামেলা সাক্ষাৎকার বাংলার রাজনীতির এক দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত দলিল হয়ে রইল।
