টাইটানিকের চেয়েও বড় ‘আকাশের রানি’ ধ্বংস হয় মাত্র ৩৪ সেকেন্ডে! নেপথ্যে কি হিটলারের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নিউজ ডেস্ক: ১৯৩৭ সালের ৬ মে। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৭টা। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আটলান্টিক পেরিয়ে আমেরিকার নিউ জার্সির লেকহার্স্টে অবতরণ করতে যাচ্ছিল বিশালাকায় এক এয়ারশিপ। নাম তার ‘হিন্ডেনবার্গ’। নাৎসি জার্মানির অহংকার, যাকে বলা হতো ‘আকাশের রানি’। দৈর্ঘ্যে প্রখ্যাত টাইটানিক জাহাজের চেয়ে মাত্র ২৪ মিটার ছোট এই যানটি যখন মাটি ছোঁয়ার অপেক্ষায়, তখনই ঘটল সেই বীভৎস কাণ্ড। চোখের পলকে আগুনের গোলায় পরিণত হলো স্বপ্নযানটি। মাত্র ৩৪ সেকেন্ড—অর্থাৎ এক মিনিটেরও কম সময়ে ভস্মীভূত হয়ে গেল বিশ্বের বৃহত্তম এয়ারশিপ। ৩৫ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু আর একরাশ রহস্য রেখে আজও ইতিহাসের পাতায় অমীমাংসিত হয়ে আছে হিন্ডেনবার্গ ট্র্যাজেডি।
আকাশে ভাসমান এক রাজপ্রাসাদ
এয়ারশিপ বা হাওয়াজাহাজ বর্তমানের আধুনিক বিমানের চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এটি কেবল ভ্রমণের মাধ্যম ছিল না, ছিল আভিজাত্যের চরম নিদর্শন। হিন্ডেনবার্গের ভেতরে ছিল বিলাসবহুল কামরা, বিশাল ডাইনিং হল, এমনকি একটি পিয়ানো রাখা লাউঞ্জও। এর ভাড়া ছিল আকাশছোঁয়া—৭০০ ডলার, যা বর্তমান সময়ের হিসেবে কয়েক লক্ষ টাকার সমান। ৩৬ জন যাত্রীর জন্য নিয়োজিত ছিলেন ৬১ জন ক্রু সদস্য। অর্থাৎ যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্যে কোনো খামতি রাখা হতো না। ১৮৫২ সালে হেনরি গিফার্ড প্রথম এয়ারশিপ তৈরি করলেও, কাউন্ট ফার্দিনান্দ ভন জেপলিনের হাতেই এটি পূর্ণতা পায়।
হিটলার বনাম হুগো একনার: শত্রুতার জেরেই কি এই ধ্বংসলীলা?
হিন্ডেনবার্গ ধ্বংসের পেছনে যে কয়টি তত্ত্ব প্রচলিত আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে রোমহর্ষক হলো অ্যাডলফ হিটলারের চক্রান্ত। এই এয়ারশিপের নির্মাতা সংস্থা ‘জেপলিন কো ম্পা নি’-র মালিক ছিলেন হুগো একনার। তিনি ছিলেন হিটলারের ঘোর বিরোধী। নাৎসিদের উত্থানের সময় থেকেই তিনি প্রকাশ্যে ফুয়েরারের সমালোচনা করতেন। হিটলার চেয়েছিলেন এই বিশালাকায় যানের নাম হোক তাঁর নামে, কিন্তু একনার তৎকালীন জার্মান প্রেসিডেন্ট ‘হিন্ডেনবার্গ’-এর নামে এর নামকরণ করেন।
এমনকি নাৎসি বাহিনীর চাটুকারদের ক্রু হিসেবে নিয়োগ করতেও আপত্তি জানিয়েছিলেন একনার। অনেকের ধারণা, এই ব্যক্তিগত অপমান এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রতিশোধ নিতেই কি হিটলার গোপনে নাশকতার ছক কষেছিলেন? যদিও ধ্বংসাবশেষে কোনো বিস্ফোরকের চিহ্ন না মেলায় এই তত্ত্ব শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি।
প্রকৃতি নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি: আসল কারণ কী?
দুর্ঘটনার দিন আকাশ ছিল মেঘলা। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, অবতরণের সময় বজ্রপাতের ফলে এয়ারশিপটিতে আগুন ধরে যায়। তবে আধুনিক গবেষকরা অন্য একটি কারণকে বেশি গুরুত্ব দেন। সেটি হলো ‘হাইড্রোজেন লিক’। হিন্ডেনবার্গ উড়ত অত্যন্ত দাহ্য হাইড্রোজেন গ্যাসের সাহায্যে। মনে করা হয়, কোনো কারণে গ্যাস লিক করে বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসায় স্থির তড়িৎ বা আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
এয়ারশিপ যুগের অবসান
হিন্ডেনবার্গের এই ৩৪ সেকেন্ডের অগ্নিকাণ্ড বিশ্বজুড়ে এয়ারশিপের ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধকার করে দেয়। সাধারণ মানুষের মনে আকাশ ভ্রমণের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র ভীতি তৈরি হয়। এরপরই দ্রুত গতিতে উন্নত হতে শুরু করে বর্তমানের এরোপ্লেন প্রযুক্তি, যা সস্তা এবং অনেক বেশি নিরাপদ। আজ হিন্ডেনবার্গ কেবল ইতিহাসের এক ট্র্যাজেডি হয়ে বেঁচে আছে, যেখানে মিশে আছে নাৎসি গর্ব, ব্যক্তিগত শত্রুতা আর এক রহস্যময় আগুনের লেলিহান শিখা।

