ট্রাম্পের গলায় শাহবাজ-মুনির বন্দনা আর সীমান্তে বারুদের গন্ধ! পাক-আফগান সংঘাত কি এবার বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটন
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড়। একদিকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে আছড়ে পড়ছে কামানের গোলা, অন্যদিকে হোয়াইট হাউস থেকে ভেসে আসছে পাক নেতৃত্বের প্রতি দরাজ প্রশংসা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য ঘিরে এখন তোলপাড় বিশ্ব কূটনীতি। দীর্ঘ ২৬০০ কিলোমিটারের ডুরান্ড লাইন বরাবর যখন ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ চরমে, ঠিক তখনই পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে ‘অসাধারণ মানুষ’ বলে সার্টিফিকেট দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের দরাজ সার্টিফিকেট ও মধ্যস্থতার টোপ
শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, পাকিস্তানের বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত রসায়ন অত্যন্ত মজবুত। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি পাকিস্তানের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলি। ওদের প্রধানমন্ত্রী এবং জেনারেল দুজনেই দারুণ মানুষ। আমি তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে খুব সম্মান করি। পাকিস্তান বর্তমানে অসাধারণ কাজ করছে।” শুধু প্রশংসাই নয়, প্রয়োজন পড়লে ইসলামাবাদ ও কাবুলের এই রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে তিনি নিজে মধ্যস্থতা করতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই অবস্থান তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের জন্য একপ্রকার প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সীমান্তে ‘খোলা যুদ্ধ’ ও লাশের পাহাড়
আফগানিস্তানের কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে পাকিস্তানের অতর্কিত বিমান হামলার পর পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ইসলামাবাদ সরকারিভাবে এই পরিস্থিতিকে ‘খোলা যুদ্ধ’ বা ‘Open War’ বলে অভিহিত করেছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, সীমান্ত সংঘর্ষে তাদের ১২ জন জওয়ান প্রাণ হারিয়েছেন। পাল্টা জবাবে আফগানিস্তানের তালিবান সরকার দাবি করেছে, তাদের অন্তত ১৩ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। দুই পক্ষই একে অপরের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান বাড়িয়ে পেশ করছে, যা যুদ্ধের দামামাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
ওয়াশিংটনের সমর্থন কি ইসলামাবাদের দিকেই
যুদ্ধের এই আবহে আমেরিকার অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন এম হুকার সরাসরি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালোচের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। হুকার সাফ জানিয়েছেন, তালিবানি সন্ত্রাস ও হামলার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার পাকিস্তানের রয়েছে এবং এই আত্মরক্ষার লড়াইয়ে ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের পাশেই আছে। এই প্রকাশ্য সমর্থন যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানের মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্কিন নাগরিকদের জন্য রেড অ্যালার্ট
সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের বড় শহরগুলোতেও নাশকতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে বড়সড় জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় মার্কিন দূতাবাস ও কনসুলেট তাদের নাগরিকদের জন্য কড়া নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন মিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষ করে করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদের মতো শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। মার্কিন নাগরিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন তাঁরা সামরিক ঘাঁটি, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং জনবহুল এলাকা এড়িয়ে চলেন।
কাতার ও রাষ্ট্রপুঞ্জের দৌত্য
যখন গোলাবারুদের লড়াই থামার নাম নেই, তখন নেপথ্যে সক্রিয় হয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষকে বসাতে পুনরায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ময়দানে নেমেছে কাতার। তালিবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান চান। তবে ট্রাম্পের এই নতুন ‘পাক-প্রীতি’ দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে ঘোরায়, এখন সেটাই দেখার।

