মাটির নিচে কি পরমাণু বোমার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান? স্যাটেলাইট ছবিতে ফাঁস তেহরানের ভয়ঙ্কর গোপন বাঙ্কার – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নিউজ ডেস্ক : ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যখন কূটনীতির টেবিলে দড়ি টানাটানি চলছে, ঠিক তখনই মাটির গভীরে যুদ্ধের প্রস্তুতি সেরে রাখছে ইরান। সম্প্রতি সামনে আসা একাধিক উচ্চ-প্রযুক্তির স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ (Satellite Images) বিশ্বজুড়ে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটনের নজরদারি সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি’ (ISIS)-এর পেশ করা রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমান হামলা থেকে বাঁচতে নিজেদের পরমাণু কেন্দ্রগুলিকে দুর্ভেদ্য কংক্রিটের বাঙ্কারে মুড়ে ফেলছে আয়াতুল্লাহ খোমেইনির দেশ।
পার্চিনে রহস্যময় ‘সারকোফেগাস’ : মাটির নিচে লুকোচুরি
তেহরান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পার্চিন সামরিক কমপ্লেক্স এখন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দাদের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গত দুই থেকে তিন সপ্তাহের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সেখানে ‘টালেঘান ২’ নামক কেন্দ্রটিকে দ্রুত কংক্রিটের একটি শক্তিশালী আবরণে (Sarcophagus) ঢেকে ফেলা হচ্ছে। ১৩ ফেব্রুয়ারির ছবিতে স্পষ্ট, মূল কাঠামোর চারপাশে কংক্রিটের কাজ শেষ করে এখন তার ওপর কয়েক স্তর মাটির প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে।
আইসিস প্রধান ডেভিড অলব্রাইট সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রটি খুব শীঘ্রই একটি অদৃশ্য বাঙ্কারে পরিণত হবে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কেবলই একটি মাটির ঢিপি, কিন্তু এর ভেতরেই চলতে পারে ইরানের সবথেকে সংবেদনশীল পরমাণু গবেষণা। উঁচু নিরাপত্তা প্রাচীর এবং ভেতরে থাকা কংক্রিট মিক্সিং প্ল্যান্ট প্রমাণ করছে যে, এই পরিকাঠামোকে আকাশপথের হামলা থেকে সুরক্ষিত করতে মরিয়া ইরান।
নাটানজ ও এসফাহানে পাহাড়ি টানেলের জাল
শুধু পার্চিন নয়, নাটানজ পরমাণু কেন্দ্রের কাছে ‘কোলাং-গাজ লা’ পাহাড়ের নিচেও কর্মতৎপরতা তুঙ্গে। ১০ ফেব্রুয়ারির ছবি অনুযায়ী, পাহাড়ের নিচের টানেলগুলির প্রবেশপথ বিশাল পরিমাণ পাথর, মাটি ও কংক্রিট দিয়ে শক্তিশালী করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ‘ওভারবার্ডেন’ বা অতিরিক্ত সুরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করবে, যা বাঙ্কার-বাস্টার বোমার আঘাতও সইয়ে নিতে সক্ষম।
একই দৃশ্য দেখা গেছে এসফাহানেও। এর আগে এই কেন্দ্রটি হামলার মুখে পড়লেও এবার সেখানে টানেলের প্রবেশপথ আড়াল করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের গভীরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখে প্রশ্ন উঠছে—ইরান কি সেখানে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ বসিয়ে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ চালাচ্ছে?
আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক তৎপরতা
২০২৪ সালের সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ঢেলে সাজিয়েছে। পার্চিন এলাকায় জুলাই-আগস্ট মাস নাগাদ একাধিক নতুন অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট সাইট এবং বিমানবিধ্বংসী আর্টিলারি মোতায়েন করা হয়েছে। ২০০৪ সাল পর্যন্ত পার্চিনে নিউট্রন ইনিশিয়েটর ও মাল্টিপয়েন্ট ইনিশিয়েশনের মতো পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত গবেষণা চলেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানের এই তোড়জোড় সেই পুরনো স্মৃতিকেই উসকে দিচ্ছে।
কূটনীতি বনাম সামরিক প্রস্তুতি
একদিকে যখন মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরান নতুন কোনো কূটনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে আসবে, অন্যদিকে তেহরান তাদের পরমাণু পরিকাঠামোকে দুর্ভেদ্য করতে দিনরাত এক করে দিচ্ছে। আলোচনার টেবিলে নমনীয়তা দেখালেও মাটির নিচে ইরানের এই ‘কংক্রিট দেয়াল’ তুলে দেওয়া স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা কোনোভাবেই নিজেদের পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে আসতে রাজি নয়।
বিশ্বের নজর এখন তেহরানের এই গোপন বাঙ্কারগুলোর দিকে—এগুলো কি কেবলই আত্মরক্ষার ঢাল, নাকি বড় কোনো যুদ্ধের মহড়া? উত্তর লুকিয়ে আছে সেই কংক্রিটের অন্ধকার গভীরে।

