মার্কিন শর্ত নাকি মরণফাঁদ? যুদ্ধের দামামা বাজিয়েও কেন হার মানছে না ইরান – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা। একদিকে ইরানি জলসীমার দিকে এগোচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন পরমাণুচালিত রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, অন্যদিকে তেহরানের স্পষ্ট বার্তা— ‘ঝড় বপন করলে ঘূর্ণিঝড়ই ঘরে তুলবে’। প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কেন একবিন্দু নতি স্বীকার করছে না ইরান?
আত্মসমর্পণের শর্ত বনাম অস্তিত্বের লড়াই
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তেহরানের চোখে সেগুলো আলোচনার প্রস্তাব নয়, বরং ‘আত্মসমর্পণের দলিল’। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ইসরায়েলের জন্য হুমকিস্বরূপ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কমানো এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন ত্যাগ করার অর্থ হলো ইরানের কয়েক দশকের তৈরি করা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ ভেঙে ফেলা।
ইরানি নেতৃত্বের বিশ্বাস, এই শর্তগুলো মেনে নিলে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিটাই ধসে পড়বে। তাদের ভাষায়, আধুনিক বিমানবাহিনীর অভাব পূরণ করে যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, তা বিসর্জন দেওয়া মানে নিজেদের পুরোপুরি অরক্ষিত করে তোলা।
খামেনির কঠিন হিসাব-নিকাশ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির সামনে এখন দুটি পথ— হয় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠিন শর্ত মেনে নেওয়া, না হয় সীমিত যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়া। খামেনির কাছে কৌশলগত পশ্চাদপসরণ বা আত্মসমর্পণ যুদ্ধের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক মনে হতে পারে। কারণ, একবার নতি স্বীকার করলে দীর্ঘ তিন দশকের শাসনের বৈধতা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা সংকটে পড়তে পারে।
যুদ্ধের ঝুঁকি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
তবে এই সংঘাতের পথ মোটেও মসৃণ নয়। মার্কিন হামলায় যদি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব বা রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে দেশের ভেতরে থাকা পুঞ্জীভূত জনঅসন্তোষ দাবানলের মতো জ্বলে উঠতে পারে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে হাজারো মানুষের মৃত্যুর ক্ষত এখনো টাটকা। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর মুদ্রাস্ফীতিতে বিপর্যস্ত জনজীবন যুদ্ধের ধাক্কা কতটুকু সামলাতে পারবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবার চাল
আমেরিকার জন্যও এই পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তির নয়। যদিও সামরিকভাবে তারা বহুগুণ শক্তিশালী, কিন্তু ইরানের ক্ষমতার শূন্যতা মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় বিশৃঙ্খলা বা কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটাতে পারে।
বর্তমানে তেহরান যে অবস্থানে রয়েছে, তাতে তারা ‘সবচেয়ে খারাপ’ বা আত্মসমর্পণকে বাদ দিয়ে ‘সবচেয়ে খারাপের মধ্যে সেরা’ অর্থাৎ একটি সীমিত কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য সংঘাতের দিকেই হয়তো বেশি ঝুঁকছে। পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বোমাবর্ষণের চিহ্ন আর সাগরে রণতরীর মহড়া বলে দিচ্ছে, সমঝোতার জানলা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।

