যুদ্ধের অভিশাপ কি শুধু বারুদ আর রক্তে? মার্কিন অর্থনীতিবিদের এক ভয়ংকর সত্য যা কাঁপিয়ে দিচ্ছে বিশ্বকে – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
ইতিহাস সাক্ষী, যুদ্ধের দামামা বাজলেই বিশ্ববাসীর নজর যায় সেনার গতিবিধি আর তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির ওপর। কিন্তু ১৯১৬ সালে মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেএম ক্লার্ক যে রূঢ় বাস্তব সামনে এনেছিলেন, বর্তমান পশ্চিম এশিয়া সংকট যেন তারই প্রতিফলন। যুদ্ধ শুধু আজকের বাজেট ধ্বংস করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধি আর সম্ভাবনাকে কেড়ে নেয়।
টাকার অঙ্কে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষত
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-ইজরায়েল সংঘাত শুরুর মাত্র ছয় দিনে পেন্টাগন খরচ করে ফেলেছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ৯০ কোটি ডলার! কিন্তু এটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। গোলাবারুদ আর জ্বালানির এই খরচের বাইরেও রয়েছে আহত সৈনিকদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিশাল বোঝা, যা কয়েক দশক ধরে সরকারি কোষাগারকে পঙ্গু করে রাখে।
জ্বালানি সংকট ও বিশ্ববাজারের নাভিশ্বাস
যুদ্ধের প্রথম আঘাতই এসেছে জ্বালানির ওপর। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম কয়েক সপ্তাহেই ৭২ ডলার থেকে লাফিয়ে ১১৩ ডলারে পৌঁছেছে—প্রায় ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি। হরমোজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারের ২০ শতাংশ তেল ও ৩৩ শতাংশ হিলিয়াম সরবরাহ এখন হুমকির মুখে। ইরান কার্যত যুদ্ধের ময়দানের চেয়েও বড় আঘাত হানছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
ভেঙে পড়া সাপ্লাই চেইন
কাতার বিশ্বের অন্যতম বড় হিলিয়াম উৎপাদক। চিপ তৈরির যন্ত্র সচল রাখতে যা অপরিহার্য। হিলিয়াম সংকট মানেই দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের চিপ নির্মাণ থমকে যাওয়া। ফলে ল্যাপটপ থেকে গাড়ি—সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। একেই অর্থনীতিবিদরা বলছেন সাপ্লাই চেইনের মহাবিপর্যয়।
ভবিষ্যৎ যখন আমানত রাখা হয় যুদ্ধের আগুনে
জেএম ক্লার্কের ‘পরোক্ষ খরচ’ তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধ কেবল টাকা খরচ করে না, বরং সেই সম্পদ উৎপাদনের সম্ভাবনা নষ্ট করে যা হতে পারত। কাতার ও ইরানের মধ্যকার বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ফিল্ডের পরিকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় আগামী এক দশকের গ্যাস মাটির নিচেই চাপা পড়ে থাকবে। যে ৯০ কোটি ডলার প্রতিদিন বোমায় উড়ছে, তা আসলে আগামী দিনের স্কুল, হাসপাতাল আর প্রযুক্তির বলিদান।
ধূলিসাৎ হচ্ছে উপসাগরীয় উন্নয়নের মডেল
গত এক দশকে সৌদি আরব, আমিরাত বা কাতার নিজেদের তেলের খনি থেকে গ্লোবাল হাবে রূপান্তরিত করেছিল। কিন্তু গোল্ডম্যান স্যাকসের আশঙ্কা, এই যুদ্ধে বাহরাইন বা কাতারের জিডিপি ১০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। ইরানের রণকৌশল স্পষ্ট—প্রতিবেশী দেশগুলোর গত দশ বছরের অর্জিত উন্নয়নকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। যুদ্ধ হয়তো একদিন থামবে, কিন্তু তার এই অদৃশ্য ঋণের বোঝা বইতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে।

