২০ বছর পর ছেলেকে ফিরে পেয়েও কেন ঘরে ফিরলেন না মা? ধর্ম নিয়ে ছেলের চরম শর্তে থমকে গেল পুনর্মিলন – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
February 27, 202610:05 am
কলকাতা: ২০ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এক মায়ের চোখের জল আর হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ভিড়ে হঠাৎ আসা এক চিলতে আলোর রেখা। কিন্তু সব শেষে জয় হলো না মাতৃত্বের, বরং সামনে এসে দাঁড়াল ধর্মের এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। কলকাতার একটি হোমে দুই দশক কাটানোর পর যখন ঝাড়খণ্ডে নিজের ছেলের সন্ধান পেলেন ৬২ বছর বয়সী সুশীলা মুর্মু, তখন পরিস্থিতি এমন এক মোড় নিল যা শুনে স্তম্ভিত সমাজ।
২০ বছরের দীর্ঘ লড়াই ও ঘরছাড়া হওয়ার নেপথ্যে
ঘটনার সূত্রপাত ২০০১ সালে। ঝাড়খণ্ডের দাহুপগড় গ্রামের বাসিন্দা সুশীলা দেবী এক হিন্দু ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের টানে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই গ্রামের একদল মানুষ এবং পরিবারের একাংশ তাঁর ওপর ধর্ম পরিবর্তনের জন্য প্রবল চাপ তৈরি করতে শুরু করে। সেই মানসিক ও সামাজিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং স্মৃতি হারিয়ে একসময় তিনি ঘর ছাড়েন। ভবঘুরে অবস্থায় ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছে যান কলকাতায়। সেখানে ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’র আশ্রমে গত ২০ বছর ধরে ব্রাদারদের সেবায় সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
রেডিও অপারেটরের মাধ্যমে ছেলের সন্ধান
সম্প্রতি এক অপেশাদার রেডিও অপারেটরের ঐকান্তিক চেষ্টায় সুশীলার পরিবারের হদিশ মেলে। জানা যায়, তাঁর ছেলে এখন যুবক। দীর্ঘ ২০ বছর পর মা ও ছেলের মধ্যে ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করানো হয়। সবাই ভেবেছিলেন এটি এক আবেগঘন পুনর্মিলন হতে চলেছে। কিন্তু পর্দার ওপার থেকে ছেলে যে কথাটি বললেন, তাতে উপস্থিত প্রত্যেকের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার জোগাড়।
ছেলের অদ্ভুত শর্ত ও মায়ের লড়াই
ছেলে সাফ জানিয়ে দেন, “মা, তোমাকে হিন্দু হতে হবে, তবেই বাড়িতে জায়গা মিলবে।” অর্থাৎ, নিজের জন্মদাত্রী মাকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ধর্মের দোহাই দিয়ে শর্ত চাপিয়ে দেন তিনি। ২০ বছর পর নিজের হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে দেখেও মা কিন্তু নিজের আদর্শে অটল। সুশীলা দেবী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, “আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করতে পারব না। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত।”
প্রশাসনের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি
ছেলের এই অনড় মনোভাবের কারণে আপাতত সুশীলা দেবী ওই আশ্রমেই রয়ে গেছেন, যা গত দুই দশক ধরে তাঁর ঘর হয়ে উঠেছে। তবে এই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পুলিশ কর্মকর্তা মহাবীর পণ্ডিত আশ্বাস দিয়েছেন যে, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ওই গ্রামে যাবেন এবং ছেলের সঙ্গে কথা বলবেন। আইনি ও মানবিক দিক থেকে সুশীলা যাতে সসম্মানে নিজের ভিটেতে ফিরতে পারেন, সেই চেষ্টাই চালানো হচ্ছে।
মাতৃত্ব বড় না কি ধর্মীয় গোঁড়ামি? সুশীলা মুর্মুর এই জীবনযুদ্ধ এখন সেই প্রশ্নই তুলে দিয়েছে আধুনিক সমাজের সামনে। সুশীলার মতো অসহায় মায়েদের জন্য কি ধর্মের চেয়েও বড় কোনো আশ্রয় হতে পারে না? উত্তর খুঁজছে কলকাতা।

