অজিত পওয়ারের সেই আক্ষেপ, যা শরদ পওয়ারের স্নেহের ওপর ভারী হয়ে উঠেছিল – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ১৩ মে মহারাষ্ট্রের শিরুর লোকসভা কেন্দ্রে এক নির্বাচনী সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন অজিত পওয়ার। সেই সভায় তিনি বলেছিলেন, “পওয়ার সাহেব আমাদের কাছে দেবতার মতো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রত্যেকের একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। ৮০ বছর বয়স পার হওয়ার পর নতুনদের সুযোগ দেওয়া উচিত।”
তিনি আরও যোগ করেছিলেন, “আমার বয়সও ৬০ ছাড়িয়েছে। আমাদের কি সুযোগ পাওয়া উচিত নয়? আমি যদি ওঁর ছেলে হতাম, তবে আমাকে সুযোগ দেওয়া হতো। যেহেতু আমি ওঁর ছেলে নই, তাই সুযোগ পাইনি।”
অজিত পওয়ারের সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আক্ষেপ সেদিন প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, “৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাকা যা বলেছেন, প্রশ্ন না তুলে তা পালন করেছি। সে সোনিয়া গান্ধীর বিদেশি নাগরিকত্ব ইস্যুতে কংগ্রেস ছাড়া হোক, ২০০৪ সালে এনসিপি-র মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবি ছাড়া হোক, ২০১৯-এ উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার সঙ্গে হাত মেলানো হোক বা বিজেপির সঙ্গে আলোচনা—সবই করেছি।”
অজিত পওয়ারের যুক্তি ছিল, লোকে বলে শরদ পওয়ার তাঁর ভাইপোকে রাজনীতিতে সুযোগ দিয়ে আজকের অবস্থানে এনেছেন। কিন্তু সেই একই যুক্তিতে শরদ পওয়ারকেও সুযোগ দিয়েছিলেন যশবন্তরাও চহ্বাণ। মহারাষ্ট্রের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই বি চহ্বাণ ছিলেন শরদ পওয়ারের রাজনৈতিক গুরু।
রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইয়ের মতে, অজিত পওয়ারের মনে দুটি বড় আক্ষেপ ছিল। প্রথমত, দল ভাগের আগে তিনি এনসিপি-র সভাপতি হতে পারেননি, আর দ্বিতীয়ত, তিনি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেননি।
গত বুধবার সন্ধ্যায় ৮৫ বছর বয়সী শরদ পওয়ার অত্যন্ত আবেগঘন ও কম্পিত কণ্ঠে একটি বিবৃতি পাঠ করছিলেন। বিমান দুর্ঘটনায় ভাইপো অজিত পওয়ারের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ শরদ পওয়ার প্রায় দেড় মিনিটের সেই বিবৃতিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাংবাদিক জয়দেব ডোলে জানান, তিনি এই প্রথম শরদ পওয়ারকে প্রকাশ্যে এভাবে কাঁদতে দেখলেন।
বিবৃতিতে শরদ পওয়ার বলেন, “অজিত পওয়ারের অকাল মৃত্যু মহারাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। রাজ্য একজন দক্ষ ও নির্ণায়ক নেতাকে হারালো। এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।”
২০২৩ সালের জুলাই মাসে তিক্ততা নিয়ে দল ছাড়লেও পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। সাংবাদিক সুধীর সূর্যবংশী জানান, “অজিত পওয়ারের কাছে শরদ পওয়ার ছিলেন বাবার মতো। অজিতের বাবা অনন্ত গোবিন্দ পওয়ারের মৃত্যুর পর শরদ পওয়ারই তাঁর সব দায়িত্ব পালন করেছিলেন।”
শরদ পওয়ারের মনে ছিল না কোনো তিক্ততা
শরদ পওয়ারের কন্যা সুপ্রিয়া সুলেও অজিতের দলত্যাগের পর কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি। রাজদীপ সরদেশাই একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, গত মাসে শরদ পওয়ারের জন্মদিনে অজিত পওয়ার উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক পথ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও কেন সেখানে এসেছেন জানতে চাইলে অজিত বলেছিলেন, “রাজনীতি আলাদা আর পরিবার আলাদা।”
২০০৪ সালে এনসিপি ৭১টি আসন পেয়ে কংগ্রেসের (৬৯ আসন) চেয়ে এগিয়ে ছিল। অজিত পওয়ারের সামনে তখন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু এক সপ্তাহের আলোচনার পর শরদ পওয়ার কংগ্রেসের বিলাসরাও দেশমুখকে মুখ্যমন্ত্রী করতে রাজি হন।
২০০৫ সালে সুপ্রিয়া সুলে রাজনীতিতে আসার পর মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে যখন অজিত উপ-মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করেন, তখন শরদ পওয়ার ও প্রফুল্ল প্যাটেল ছগন ভুজবলকে এগিয়ে দেন। এই সব ছোটখাটো ঘটনা অজিতের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। তবে শরদ পওয়ার কখনও অজিতের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি। তিনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী নেতা।
শরদ পওয়ারেরই রাজনীতি
এনসিপি-তে শরদ পওয়ারের পর অজিত পওয়ারকেই সবথেকে বড় গণভিত্তি সম্পন্ন নেতা হিসেবে দেখা হতো। অজিত বিদ্রোহ করলে প্রফুল্ল প্যাটেল ও ছগন ভুজবলের মতো নেতারাও তাঁর সঙ্গী হন। তবে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বারামতী কেন্দ্রে অজিত পওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা পওয়ার সুপ্রিয়া সুলের কাছে পরাজিত হন। তবুও পারিবারিক স্তরে তিক্ততা আসেনি।
বলা হয়, মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘পওয়ার’ পরিবার হলো চিনিকলের চিনির মতো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অজিত পওয়ার দল চালানোর ক্ষেত্রে তাঁর কাকার মতোই ছিলেন। এনসিপি কোনো বৈপ্লবিক কারণে তৈরি হয়নি, বরং ১৯৯৯ সালে সোনিয়া গান্ধীর বিদেশি নাগরিকত্বের ইস্যু তুলে শরদ পওয়ার, তারিক আনোয়ার ও পি এ সাংমা দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু চার মাসের মধ্যেই ক্ষমতার স্বার্থে তাঁরা আবার কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধেন।
অজিত পওয়ারও তাঁর কাকার থেকে এই ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ বা বাস্তববাদ শিখেছিলেন। রাজদীপ সরদেশাইয়ের মতে, অজিত পওয়ার বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঠিক সেটাই করেছিলেন যা শরদ পওয়ার আশির দশকে বা ২০০০ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে করেছিলেন।
অজিত পওয়ার কখনোই জাতীয় রাজনীতিতে আগ্রহ দেখাননি, তাঁর পুরো লক্ষ্য ছিল মহারাষ্ট্র। তাঁর মৃত্যুতে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

