ইনস্টাগ্রামে ‘বিপজ্জনক’ কিছু খুঁজলেই ধরে ফেলবে মা-বাবা, কড়া নজরদারিতে মেটার নতুন চমক – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নিউজ ডেস্ক: বর্তমান ডিজিটাল যুগে কিশোর-কিশোরীদের স্মার্টফোন আসক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে অনলাইনে আত্মক্ষতি বা আত্মহত্যার মতো সংবেদনশীল বিষয়বস্তুর সহজলভ্যতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় এক বৈপ্লবিক এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম। তাদের নতুন ‘প্যারেন্টাল সুপারভিশন টুলস’-এর মাধ্যমে এখন থেকে সন্তানদের প্রতিটি ‘বিপজ্জনক’ সার্চের হদিশ পাবেন অভিভাবকরা।
নজরদারিতে নতুন মাত্রা: কী থাকছে এই ফিচারে?
মেটা (Meta) জানিয়েছে, কোনো কিশোর বা কিশোরী যদি ইনস্টাগ্রামে বারবার আত্মহত্যা, আত্মক্ষতি বা নিজেদের ক্ষতি করতে পারে এমন কোনো নির্দিষ্ট শব্দ বা বাক্যাংশ অনুসন্ধান করে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সেই খবর পৌঁছে যাবে তাদের মা-বাবার কাছে। এটি মূলত একটি ‘অ্যালার্ট’ সিস্টেম হিসেবে কাজ করবে, যা সন্তান বিপদে পড়ার আগেই অভিভাবকদের সতর্ক করে দেবে।
আগামী সপ্তাহ থেকেই আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং ক্যানাডায় এই পরিষেবা চালু হতে যাচ্ছে। তবে পর্যায়ক্রমে এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মেটার।
অভিভাবকরা কীভাবে সতর্কবার্তা পাবেন?
এই সুরক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যদি কোনো নাবালক ব্যবহারকারী ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু সার্চ করে, তবে অভিভাবকরা নিম্নলিখিত মাধ্যমে নোটিফিকেশন পাবেন:
- সরাসরি ইমেল: নিবন্ধিত ইমেল আইডিতে বিস্তারিত অ্যালার্ট পাঠানো হবে।
- ইন-অ্যাপ নোটিফিকেশন: ইনস্টাগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার করার সময়ই পপ-আপ মেসেজ আসবে।
- টেক্সট ও হোয়াটসঅ্যাপ: মোবাইলে সরাসরি মেসেজ বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও এই সতর্কতা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মেটা কেবল সতর্ক করেই দায় সারছে না। এই নোটিফিকেশনের সাথে সাথে অভিভাবকদের জন্য বিশেষজ্ঞদের তৈরি বিশেষ ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকাও পাঠানো হবে। সন্তান যদি কোনো মানসিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যায়, তবে তার সাথে কীভাবে সংবেদনশীল আলোচনা করতে হবে বা তাকে কীভাবে সামলাতে হবে, সেই বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেবে এই টুল।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নজরদারি
ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে মেটা আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবছে। বর্তমানে অনেক কিশোর-কিশোরীই একাকীত্ব বা মানসিক সমস্যায় মানুষের বদলে এআই (AI) চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মেটা ঘোষণা করেছে যে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এআই-এর সাথে কথোপকথনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিভাবকীয় নোটিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা হবে। যদিও মেটার দাবি তাদের এআই নিরাপদ উত্তরের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত, তবুও অতিরিক্ত সুরক্ষার খাতিরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের মত ও মেটার ভাবমূর্তি
‘সাইবারবুলিং রিসার্চ সেন্টার’-এর কো-ডিরেক্টর সমীর হিন্দুজা এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কিশোর-কিশোরীরা যখন কোনো চরম পদক্ষেপের কথা চিন্তা করে বা সেই সংক্রান্ত তথ্য খোঁজে, তখন দ্রুত হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা যদি মা-বাবার হাতে থাকে, তবে অনেক প্রাণ অকালেই ঝরে পড়া থেকে রক্ষা পাবে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বর্তমানে আমেরিকায় শিশুদের সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা এবং ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামকে আসক্তিমূলকভাবে ডিজাইন করার অভিযোগে একাধিক আইনি লড়াই লড়ছে মেটা। সমালোচকদের একাংশের মতে, আদালতের চাপ এবং নিজেদের হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধার করতেই মেটা তড়িঘড়ি এই সুরক্ষা কবচ নিয়ে এসেছে। কারণ এর আগে তাদের বিরুদ্ধে নাবালকদের যৌন শোষণ থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছিল।
এখন দেখার বিষয়, এই প্রযুক্তিগত নজরদারি সন্তানদের ব্যক্তিগত পরিসর বা ‘প্রাইভেসি’ এবং সুরক্ষার মধ্যে কতটা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং বাস্তবে এটি কতটা জীবনদায়ী হয়ে ওঠে।

