ডিজে লাইট ও পার্টি লেজার কেড়ে নিতে পারে আপনার দৃষ্টিশক্তি: চক্ষু বিশেষজ্ঞের চাঞ্চল্যকর তথ্য – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
ডিজে পার্টিতে ব্যবহৃত লেজার লাইট এক যুবকের চোখের দৃষ্টি আকস্মিকভাবে কেড়ে নিয়েছে। এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে এনেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আশিশ মারকান (যিনি ইনস্টাগ্রামে ‘@your_retina_doctor’ নামে পরিচিত)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে লেজার রশ্মির সংস্পর্শে এসে রেটিনা পুড়ে যেতে পারে।
ডা. মারকান জানিয়েছেন, এক যুবক তাঁর ডান চোখের দৃষ্টি হঠাৎ হারিয়ে ফেলার অভিযোগ নিয়ে আসেন। জানা গেছে, তিনি একটি অনুষ্ঠানে ডিজে-র ব্যবহৃত লেজার লাইটের দিকে বারবার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। পরীক্ষার পর দেখা যায় তাঁর দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা কমে ‘৬/১৮’-এ দাঁড়িয়েছে।
চোখের অভ্যন্তরীণ অংশ পরীক্ষার জন্য ‘ফান্ডাস এগজামিনেশন’ করার পর ধরা পড়ে যে, ওই যুবকের ‘ম্যাকুলার ইনজুরি’ হয়েছে এবং রেটিনার বাইরের স্তরগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোগীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে ডাক্তার নিশ্চিত হন যে, বারবার লেজার রশ্মি সরাসরি চোখে পড়ার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
‘লেজার-ইনডিউসড ম্যাকুলোপ্যাথি’ কী?
যখন উচ্চ শক্তির উজ্জ্বল লেজার রশ্মি চোখের রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশ বা ‘ম্যাকুলা’কে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন তাকে ‘লেজার-ইনডিউসড ম্যাকুলোপ্যাথি’ বলা হয়। ম্যাকুলা আমাদের স্বচ্ছ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির জন্য দায়ী। ডা. মারকান ব্যাখ্যা করেন যে, সামান্য সময়ের জন্য বা বারবার লেজার রশ্মির সংস্পর্শে এলে রেটিনা পুড়ে যেতে পারে, যার ফলে দৃষ্টি ঝাপসা বা বিকৃত হয়ে যায়।
চিকিৎসকদের সতর্কতা
২০২৪ সালে পুনা অফথালমোলজিক্যাল সোসাইটি (POS) বিভিন্ন ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত লেজার লাইটের ক্ষতিকারক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তারা জানিয়েছিল, ৫ মিলিওয়াট (5 MW)-এর বেশি ক্ষমতার লেজার পয়েন্টার বা লাইট রেটিনার অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। তাই এই আলোগুলো সবসময় উপরের দিকে রাখা উচিত।
POS-এর সভাপতি ডা. রাধিকা পরাঞ্জপে জানান, লেজারের প্রভাবে রেটিনায় রক্তক্ষরণ এবং ফোলাভাব দেখা দেওয়ার অনেক ঘটনা রয়েছে। রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো সরাসরি লেজারের সংস্পর্শে এলে রক্তক্ষরণ ঘটে দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সাময়িক সংস্পর্শে মাথাব্যথা, চোখের ব্যথা বা কয়েক দিনের জন্য দৃষ্টি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
অন্য এক বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় পাতিল সতর্ক করে বলেন, গুরুতর ক্ষেত্রে রেটিনাল হেমারেজ হতে পারে, যা চিকিৎসার পরেও সারিয়ে তোলা সম্ভব হয় না।
কোন ধরনের লেজার লাইট বেশি বিপজ্জনক?
অ্যাটোমিক এনার্জি রেগুলেটরি বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, লেজারকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
- ক্লাস ১: এটি সবচেয়ে নিরাপদ, চোখ বা ত্বকের কোনো ক্ষতি করে না।
- ক্লাস ২: দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ক্ষতি হতে পারে।
- ক্লাস ৩ ও ৪: এগুলো মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, বিশেষ করে চোখ ও ত্বকের জন্য।
কেন লেজার চোখের ক্ষতি করে?
লেজার রশ্মি যখন চোখে পড়ে, তখন চোখের লেন্স সেই সমস্ত রশ্মিকে রেটিনার একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করে। এটি ঠিক ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে সূর্যের আলোকে কাগজে ফেলে আগুন ধরানোর মতো কাজ করে।
ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ-এর একটি গবেষণা বলছে, মূলত উচ্চ ক্ষমতার রিক্রিয়েশনাল লেজার বা অবৈধভাবে বিক্রি হওয়া ৫ মিলিওয়াটের বেশি ক্ষমতার লেজার প্রজেক্টরগুলো তাৎক্ষণিক চোখের ইনজুরি ঘটায়।
লক্ষণ ও প্রতিকার
ডা. আশিশ মারকান জানিয়েছেন, লেজারের কারণে চোখের ক্ষতির লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, কেন্দ্রীয় দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া (central scotoma) বা পড়তে অসুবিধা হওয়া। লেজার লাইটের সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই হলো বাঁচার একমাত্র উপায়, কারণ রেটিনার কিছু ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে। সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে দৃষ্টিশক্তি কিছুটা উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।

