ঢাকা কি ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের রণক্ষেত্র? বাংলাদেশের ভোট ঘিরে ঘনীভূত ভূ-রাজনৈতিক মেঘ – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পারদ ততই চড়ছে। তবে এবারের লড়াই কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রূপ নিয়েছে দুই বিশ্বশক্তি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এক ছায়াযুদ্ধে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের এই প্রক্রিয়ায় এখন সরাসরি হস্তক্ষেপ আর পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারির ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য ও চীনের তীব্র প্রতিক্রিয়া
সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ‘বিদেশি ক্ষতিকারক প্রভাব মোকাবিলা’ সংক্রান্ত একটি বিবৃতি এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ওয়াশিংটনের এই অবস্থানকে বেইজিং তাদের আঞ্চলিক স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। চীন অনতিবিলম্বে এই বিবৃতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছে। কূটনীতিকদের এই বাকযুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, ঢাকার শাসনব্যবস্থা এখন গ্লোবাল পলিটিক্সের কেন্দ্রবিন্দুতে।
নেপথ্যে যখন বিআরআই বনাম ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল
আমেরিকার মাথাব্যথার মূল কারণ বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় বাংলাদেশে যে বিশাল অবকাঠামো এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে চীন, তাকে নিজেদের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’র জন্য বড় হুমকি মনে করছে মার্কিন প্রশাসন। অন্যদিকে, র্যাব-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা নীতির মতো অস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র যখন গণতন্ত্রের সুরক্ষা দিতে চাইছে, বেইজিং তখন একে দেখছে একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ হিসেবে।
শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের শিক্ষা
মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বারবার শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক ঋণের জালে জড়িয়ে বাংলাদেশ হয়তো কৌশলগতভাবে ওয়াশিংটনের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তবে চীন এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
বাংলাদেশের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
দুই পরাশক্তির এই রেষারেষির মাঝে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের সার্বভৌমত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে:
- ভারসাম্যের কূটনীতি: ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
- স্বচ্ছ নির্বাচন: বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ এড়াতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করাই হবে প্রধান উপদেষ্টার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
- অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণই হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল শক্তি।
২০২৬-এর নির্বাচন এখন আর কেবল ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, এটি হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ও চীনের প্রভাব বিস্তারের এক চরম পরীক্ষা। বাংলাদেশ কি পারবে এই বৈশ্বিক টানাপোড়েন সামলে নিজের স্বাধীন পথ বেছে নিতে? সারা বিশ্বের চোখ এখন সেদিকেই।

