দুবাইয়ের আকাশ জুড়ে আগুনের গোল্লা আর হাহাকার, তবে কি বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে? – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নিউজ ডেস্ক (ডেইলিহান্ট): আরব সাগরের তীরে শান্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ শহর দুবাই কি রণক্ষেত্রে পরিণত হতে চলেছে? রবিবার সকালে যে দৃশ্য দেখল বিশ্ববাসী, তাতে সেই আশঙ্কাই প্রবল হচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকার মধ্যকার চলমান সংঘাত এবার আছড়ে পড়ল সংযুক্ত আরব আমিরাতের হৃদপিণ্ডে। আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া ড্রোন এবং মিসাইল দুবাই ও আবুধাবির মতো শহরগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা
রবিবার ভোরে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় কেঁপে ওঠে রানওয়ে ও টার্মিনাল। বিমানবন্দরের একটি কনকোর্সে সরাসরি আঘাত হানার ফলে চারজন গুরুতর আহত হন। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, যাত্রীরা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন টার্মিনালের ভেতর দিয়ে প্রাণভয়ে ছুটছেন। একই সময়ে পাম জুমেরাহর বিলাসবহুল ফায়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলের সামনে একটি বহুতল ভবনে বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। বিশাল এক আগুনের গোলা আকাশকে কমলা রঙে রাঙিয়ে দেয়, যা কয়েক মাইল দূর থেকেও দৃশ্যমান ছিল। এই ঘটনায় চারজন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
আবুধাবি ও বাহরাইনেও মৃত্যুমিছিল
হামলা শুধু দুবাইয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির আবাসিক এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতে ধ্বংস হওয়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ে। এতে সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি একজন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, বাহরাইনের মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরের কাছেও একের পর এক ড্রোন হামলা চালানো হয়। সেখানে অন্তত তিনটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কেন ইরান বেছে নিল তার সবথেকে বড় বাণিজ্যিক সঙ্গীকে?
দুবাই বিশ্বের অন্যতম বড় বিজনেস হাব এবং ইরানের একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। তা সত্ত্বেও কেন তেহরান এখানে হামলা চালাল? সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে ইরানের এক গভীর ও ভয়াবহ রণকৌশল:
- মার্কিন ঘাঁটিকে নিশানা: ইউএই-র ‘আল ধাফরা এয়ার বেস’ এবং ‘জেবেল আলী পোর্ট’ মূলত মার্কিন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ইরান এই ঘাঁটিগুলোকে নিজের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি বলে মনে করে।
- অপারেশন এপিক ফিউরি ঠেকানো: আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চালাচ্ছে। ইরান চায় দুবাইয়ের মতো অর্থনৈতিক কেন্দ্রে আঘাত করে পশ্চিমী বিশ্বের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে, যাতে তারা এই অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
- বৈধ সামরিক লক্ষ্য: তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যেসব দেশের মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো হবে, তাদের প্রত্যেককে ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্য’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
কুয়েত ও কাতারেও আতঙ্ক
কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন এবং একটি টার্মিনাল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারও জানিয়েছে যে, তাদের আল-উদেইদ এয়ার বেস (যা ওই অঞ্চলের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি) লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোঁড়া হয়েছে। দোহা এই ঘটনাকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে কড়া নিন্দা জানিয়েছে।
‘ট্রুথফুল প্রমিস ৪’ ও বিশ্ব অর্থনীতির সংকট
ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এই হামলার দায় স্বীকার করে একে ‘অপারেশন ট্রুথফুল প্রমিস ৪’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, এটি আমেরিকার অন্যায্য হামলার প্রতিশোধ। এদিকে, পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই সরবরাহ হয়। যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হতে পারে।
জর্ডান ও ইসরায়েলও জানিয়েছে যে তারা তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একাধিক ইরানি মিসাইল প্রতিহত করেছে। গোটা মধ্যপ্রাচ্য এখন এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনতে পারে।

