”ধর্ষণের অভিযোগ করায় উল্টে আমার বিরুদ্ধেই মামলা দেওয়া হলো”: ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী এক নারীর কাহিনি – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
রুত (গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে নাম পরিবর্তিত) যখন তার সঙ্গীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ জানাতে থানায় গিয়েছিলেন, তখন তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি যে তাকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। পুলিশ তার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ’ আনার পালটা মামলা দায়ের করে এবং তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর লড়াই করার পর অবশেষে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
২০২০ সালের শুরুতে রুত একজন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন। তাদের সম্পর্ক শেষ হওয়ার সাত মাস পর তিনি এই অভিযোগ আনেন। শেষবার দেখা হওয়ার দিনই ওই ঘটনাটি ঘটেছিল। রুত বলেন, ”আমার মনে হয়েছিল, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করলে আমি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারব না।”
কিন্তু পুলিশ ওই অফিসারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টে রুতের বিরুদ্ধে ‘বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার’ অভিযোগ আনে। উল্লেখ্য, ব্রিটেনে এই ধরণের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
আইনি তথ্য ও পরিসংখ্যান
ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (CPS) অনুযায়ী, ব্রিটেনে মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগের মামলা অত্যন্ত নগণ্য। ২০১১-১২ সালে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে ৫,৬৫১টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হলেও মিথ্যা অভিযোগের মামলা ছিল মাত্র ৩৫টি। মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে জেল খাটা বা পরিচয় প্রকাশ হওয়ার কারণে সামাজিকভাবে চরম আসাম্মানিত হতে হয়, তাই উচ্চপদস্থ আইনজীবীদের তত্ত্বাবধান ছাড়া এমন মামলা এগিয়ে না নেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?
২০১৯ সালের গ্রীষ্মে একটি বেদনাদায়ক যৌন অভিজ্ঞতার পর রুতের সঙ্গে ওই অফিসারের সম্পর্ক ভেঙে যায়। রুত জানিয়েছিলেন, তিনি একটি শর্তে শারীরিক সম্পর্কে রাজি হয়েছিলেন— যদি তার ব্যথা লাগে, তবে তার সঙ্গী যেন তখনই থেমে যান। কিন্তু রুত বারংবার নিষেধ করা সত্ত্বেও ওই ব্যক্তি থামেননি।
পরবর্তীতে রুত অসহ্য যন্ত্রণার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসকের পরামর্শে হওয়া সোয়াব টেস্ট এবং শারীরিক পরীক্ষায় ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। রুত প্রথমে ভয় পেলেও পরবর্তীতে পুলিশের দ্বারস্থ হন।
লুকানো অডিও রেকর্ড ও পুলিশের ভূমিকা
অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার দাবি করেন, শারীরিক সম্পর্কটি পারস্পরিক সম্মতিতে হয়েছিল। প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি অডিও ফাইল জমা দেন যা তিনি গোপনে রেকর্ড করেছিলেন। পুলিশ সেই অডিও শুনে দাবি করে যে, সেখানে রুতকে হাসতে শোনা যাচ্ছে এবং তিনি সম্মতিতে ছিলেন। এর ভিত্তিতে অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং রুতের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
আদালতের মোড় পরিবর্তন
২০২৩ সালের এপ্রিলে যখন চূড়ান্ত বিচার শুরু হয়, তখন রুতের আইনজীবী সোফি মারে আদালতে ওই অডিওটি বাজানোর দাবি জানান। প্রসিকিউশন কেবল অডিওর লিখিত অনুলিপি জমা দিতে চেয়েছিল, যা জুরিকে শোনাতে তারা রাজি ছিল না।
অডিওটি যখন আদালতে বাজানো হয়, তখন সত্য সামনে আসে। রুত বারবার ‘না’ বলছিলেন এবং তাকে যন্ত্রণায় কাতরাতে শোনা যাচ্ছিল। আর যে হাসির আওয়াজকে রুতের হাসি বলে দাবি করা হয়েছিল, তা আসলে ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা একটি পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্রের যান্ত্রিক শব্দ ছিল।
বিচার ও মুক্তি
আদালতে জেরার মুখে ওই পুলিশ অফিসার স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, রুত বাধা দিলেও তিনি থামেননি। বর্তমানে ওই অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে।
জুরি মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই রুতকে নির্দোষ ঘোষণা করে। বিচারক পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং রুতের করা ধর্ষণের অভিযোগটি পুনরায় তদন্ত করার নির্দেশ দেন। রুত বলেন, ”আমি চাই না আমার মতো পরিস্থিতি আর কারোর জীবনে আসুক।”

