বিচার ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের রাশ টানল গুজরাট হাইকোর্ট, জারি হল নয়া নির্দেশিকা

বিচার ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের রাশ টানল গুজরাট হাইকোর্ট, জারি হল নয়া নির্দেশিকা

ভারতের বিচার বিভাগীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিল গুজরাট হাইকোর্ট। বিচার প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমা ও নিয়ম নির্ধারণ করে শনিবার একটি বিশেষ নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বিচারপতি বিক্রম নাথের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই নীতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, বিচারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা চূড়ান্ত রায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই এআই ব্যবহার করা যাবে না। এই নতুন নিয়ম কেবল হাইকোর্ট নয়, বরং রাজ্যের সমস্ত জেলা আদালত, বিচারক, আদালত কর্মী এবং আইনি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ইন্টার্ন ও প্যারা-লিগ্যাল ভলান্টিয়ারদের ক্ষেত্রেও কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো বিচারের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ণ রাখা। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আইনের ব্যাখ্যা প্রদান, যুক্তি বিশ্লেষণ, প্রমাণের মূল্যায়ন এবং জামিন বা সাজা নির্ধারণের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় এআই-এর কোনো ভূমিকা থাকবে না। প্রতিটি বিচারক তাঁর দেওয়া রায় বা আদেশের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ থাকবেন। তবে বিচারিক কাজের বাইরে আদালতের প্রশাসনিক ও সহায়ক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আইটি অটোমেশন, প্রশিক্ষণের প্রেজেন্টেশন তৈরি এবং নোটিশ বা সার্কুলারের খসড়া তৈরির মতো কাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে।

আইনি গবেষণার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের সুযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। বিচারক বা কর্মীরা প্রাসঙ্গিক রায় কিংবা আইনের ধারা খুঁজে বের করতে এই প্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারলেও, প্রাপ্ত তথ্য অবশ্যই নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করে নিতে হবে। এছাড়া রায় লেখার ক্ষেত্রে ভাষা সংশোধন, বানান বা ব্যাকরণগত উন্নতির জন্য এআই ব্যবহার করা গেলেও মূল আইনি বিশ্লেষণ হতে হবে বিচারকের নিজস্ব। শুনানির ট্রান্সক্রিপশন বা অনুবাদের ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের পর তা যোগ্য অনুবাদক দ্বারা যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মামলার তালিকা তৈরি বা কজ লিস্টের মতো কেস ম্যানেজমেন্টের কাজেও নিরপেক্ষ তথ্যের ভিত্তিতে এআই ব্যবহারের সুযোগ থাকছে।

গুজরাট হাইকোর্টের এই নীতি মূলত বিচার ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে যেমন প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তেমনই ভুল তথ্য বা পক্ষপাতিত্বের মতো ঝুঁকি এড়াতেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে আদালত। বিচারপ্রার্থীদের জন্য আইনি প্রক্রিয়া সহজলভ্য করার পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আদালতের এই বার্তার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হলো যে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হলেও বিচার ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *