বিদেশি যন্ত্র ছাড়াই বাজিমাত করলেন বাংলার কলমিস্ত্রি, যার হাতের জাদুতে রক্ষা পেল রোগীর পা – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
২০১৬ সালে এক দুর্ঘটনায় উরুর হাড় ভেঙে গিয়েছিল হাওড়ার বনগ্রামের বাসিন্দা সুকুর আলি মোল্লার। সেই সময় অস্ত্রোপচার করে পায়ে রড ও স্ক্রু বসানো হয়। কিন্তু বছর কয়েক পর মুম্বইয়ে কাজে গিয়ে ফের শুরু হয় তীব্র যন্ত্রণা। কলকাতায় পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা দেখেন, পায়ের সেই রড ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। অবস্থা এতটাই জটিল যে দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য দরকার ছিল ‘ব্রোকেন নেইল টিপ রিমুভার’ নামের একটি বিশেষ যন্ত্র, যা সরকারি হাসপাতালে পাওয়া বেশ দুষ্কর এবং ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া করতে গেলে কয়েক হাজার টাকার ধাক্কা।
এই সংকটময় মুহূর্তে মুশকিল আসান হিসেবে আবির্ভূত হন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অস্থিরোগ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডাঃ সৈকত সাউ। তাঁর মনে পড়ে ছোটবেলায় দেখা গ্রামের এক দক্ষ মেকানিক অনিল বেরার কথা, যাকে গ্রামসুদ্ধ সবাই ‘অনিলদাদু’ বলে ডাকেন। তিনি মূলত চাষের কাজে ব্যবহৃত সেলো মেশিন সারাই করেন। ডাক্তারবাবু তাঁর কাছে গিয়ে সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলেন এবং যন্ত্রটির একটি নকশা বা বর্ণনা দেন।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও অভিজ্ঞতায় তুখোড় অনিল বেরা চিকিৎসকের কথা শুনেই কাজে লেগে পড়েন। নিজের কর্মশালায় বসেই তিনি তৈরি করে ফেলেন হুবহু ‘টিপ রিমুভারে’র মতো একটি যন্ত্র। গত মঙ্গলবার সেই হাতে তৈরি যন্ত্রটিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্ত করে শুরু হয় অস্ত্রোপচার। দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা ধরে চলা সেই প্রক্রিয়ায় ভাঙা রডের প্রতিটি টুকরো সফলভাবে বের করে আনেন চিকিৎসকরা। এরপর নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নতুন করে রড ও স্ক্রু বসিয়ে উরুর হাড় ফিক্স করা হয়।
অস্ত্রোপচার শেষে চিকিৎসক সৈকত সাউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জানান, ছোটবেলায় দেখা সেই অভিজ্ঞ মেকানিকের ওপর তাঁর ভরসা ছিল এবং সেই ভরসার মর্যাদা রেখেছেন অনিল বেরা। অন্যদিকে, রোগী সুকুর আলি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন চিকিৎসক এবং সেই মেকানিক দাদুকে। অনিল বেরার ছেলে প্রণব বেরা বলেন, “বাবার এই বয়সে করা এই কাজ আমাদের পরিবারের কাছে অত্যন্ত গর্বের। তিনি ডাক্তারবাবুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই অসাধ্য সাধন করেছেন।”
বাংলার এক নিভৃত গ্রামের মেকানিকের বুদ্ধিমত্তা আর চিকিৎসকের উপস্থিত বুদ্ধি মিলেমিশে এক অভাবনীয় সাফল্যের গল্প লিখল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ। প্রমানিত হলো যে, মেধা আর অভিজ্ঞতা থাকলে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবকেও তুড়ি মেরে ওড়ানো সম্ভব।

