ভাষার ওপর আঘাত এলে রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার মমতার – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী বার্তা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ভিনরাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা এবং ভাষার অমর্যাদার আবহে তাঁর এই অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মাতৃভাষার ওপর কোনো ধরনের আক্রমণ তিনি বা তাঁর সরকার কোনোভাবেই বরদাস্ত করবেন না।
২১ ফেব্রুয়ারির পুণ্যলগ্নে বিশেষ শপথ
২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালের সেই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি স্মরণে রেখে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ বিশ্বের সমস্ত ভাষা ও ভাষাভাষী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন সেই সব ভাষা-শহিদদের, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত ও জীবনানন্দের বাংলা শুধু নয়, আমরা সব ভাষাকেই শ্রদ্ধা করি। একুশের এই পুণ্য দিনে অঙ্গীকার করছি, যে কোনো ভাষার ওপর যদি আক্রমণ আসে, আমরা সবাই মিলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব।”
ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা ও রাজ্য সরকারের সাফল্য
শুধুমাত্র বাংলা নয়, রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তিক ও আঞ্চলিক ভাষাগুলোর প্রতিও তাঁর সরকার যে সমানভাবে সংবেদনশীল, তা মুখ্যমন্ত্রী সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর আমলেই রাজ্যে হিন্দি, সাঁওতালি, কুরুখ, কুড়মালি, নেপালি, উর্দু, রাজবংশী, কামতাপুরী, পাঞ্জাবি এবং তেলুগু ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাদরি ভাষার মানোন্নয়নেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।
ভাষার চর্চা অব্যাহত রাখতে এবং শৈশব থেকেই নিজ ভাষায় শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রী একাধিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন:
- রাজবংশী, কামতাপুরী ও সাঁওতালির মতো ভাষাগুলোর জন্য পৃথক অ্যাকাডেমি গঠন করা হয়েছে।
- হিন্দি অ্যাকাডেমি স্থাপনের মাধ্যমে ভাষাগত মেলবন্ধন সুদৃঢ় করা হয়েছে।
- রাজ্যের প্রতিটি মানুষ যাতে নিজস্ব মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ পায়, তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেন, যেখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন অসংখ্য ভাষাপ্রেমী। সেই মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমেই আজ আন্তর্জাতিক স্তরে ভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন ভাষাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় অসহিষ্ণুতা দেখা দিচ্ছে, তখন মমতার এই “রুখে দাঁড়ানোর” বার্তা আসলে এক বড়সড় রাজনৈতিক ও সামাজিক হুঁশিয়ারি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিশেষে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সব ভাষাই সমানভাবে সম্মানীয় এবং কোনো ভাষাকেই অন্য ভাষার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা করাই যে তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য, একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে সেই সুরই শোনা গেল তাঁর কণ্ঠে।

