মৃত্যুপুরী সম্ভল! ৭০টি চিতার আগুন নিভলেও থামেনি সুগার মিলের বিষ ছড়ানো, জল খেলেই ঘনিয়ে আসছে মৃত্যু – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলার রামনগর গ্রাম এখন এক জীবন্ত নরক। যে গ্রামে একসময় হাসিখুশি মানুষের আনাগোনা ছিল, আজ সেখানে কেবল কান্নার রোল আর শ্মশানের নিস্তব্ধতা। অভিযোগের তির স্থানীয় ধামপুর বায়ো-অরগানিক্স সুগার মিলের দিকে। এই মিলের বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত জল গ্রামের ভূগর্ভস্থ জলকে এতটাই বিষিয়ে তুলেছে যে, সেই জল পান করা এখন কার্যত আত্মহত্যার শামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৭০টি প্রাণ কেড়ে নিল ‘কালা জন্ডিস’
স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রাক্তন সেনাকর্মীদের দাবি অনুযায়ী, দূষিত জল পান করে এই গ্রামে ইতিমধ্যে ৭০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে ১০ জনেরও বেশি মানুষ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছেন। গ্রামে ঢুকলেই দেখা যায় সারিবদ্ধ খাটিয়ায় শুয়ে আছেন একের পর এক রোগী। চিকিৎসকদের মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ হেপাটাইটিস বা ‘কালা জন্ডিস’, যা এই এলাকায় মহামারির আকার ধারণ করেছে।
বাতাসে ছাই আর জলে বিষ
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, সুগার মিলের অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি মাটিতে মেশার ফলে এলাকার টিউবওয়েলের জল বিষাক্ত হয়ে গেছে। শুধু জল নয়, মিল থেকে নির্গত ছাই বাতাসে মিশে শ্বাসকষ্টের রোগীদের সংখ্যাও বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদও স্বীকার করেছে যে, এলাকার বাতাসের গুণমান অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ভূগর্ভস্থ জল পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের নড়াচড়া ও তদন্ত
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অরাজকতা নিয়ে এক প্রাক্তন সেনাকর্মী সরব হওয়ার পর অবশেষে টনক নড়েছে জেলা প্রশাসনের। সম্ভলের জেলাশাসক (DM) বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং ভূগর্ভস্থ জল বিভাগের আধিকারিকরা গ্রামের ইন্ডিয়া মার্কা হ্যান্ডপাম্পগুলো থেকে জলের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। প্রাথমিক রিপোর্টে জলের মান অত্যন্ত খারাপ আসায় মিল কর্তৃপক্ষের ওপর বড় অংকের জরিমানা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।
২৫ বছরের যন্ত্রণা ও সিস্টেমের ব্যর্থতা
রামনগর গ্রামের এই মরণফাঁদ আজকের নয়। গত ২৫ বছর ধরে এই বিষাক্ত জলের দংশন সহ্য করছেন গ্রামবাসীরা। কয়েক বছর আগে সংবাদমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে হইচই হলে সরকার হেপাটাইটিস চিকিৎসার জন্য বিশেষ ইউনিট তৈরি করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা হলেও যে কারণে এই মারণ রোগ ছড়াচ্ছে—অর্থাৎ ওই সুগার মিলের দূষণ—তা বন্ধ করার জন্য এতদিন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বর্তমানে পুরো গ্রামটি এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে। গ্রামবাসীদের দাবি কেবল একটিই—জরিমানা নয়, মিলের বিষাক্ত বর্জ্য নির্গমন চিরতরে বন্ধ করা হোক এবং তাদের শুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। নয়তো এই ৭০টি চিতার তালিকা দীর্ঘতর হতেই থাকবে।

