যুদ্ধ রুখতে মরিয়া সৌদি ও তুরস্ক: কেন ইরান-আমেরিকা সংঘাত চাইছে না উপসাগরীয় দেশগুলো? – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ চরমে উঠছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জুনের চেয়েও ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়েছেন ইরানকে। ইতিমধ্য়েই মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে গেছে মার্কিন নৌবহর, যার মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’। তবে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই যুদ্ধ রুখতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সৌদি আরব ও তুরস্ক।
তুরস্কের বিদেশমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের ওপর আমেরিকার হামলা ভুল পদক্ষেপ হবে। তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও (ইউএই) কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার কথা বলেছে।
ওয়াশিংটনে সৌদি ও ইজরায়েলি প্রতিনিধিদের ভিড়
এই সংকটের মধ্যে সৌদি আরব ও ইজরায়েলের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা আমেরিকা পৌঁছেছেন। তবে দুপক্ষের উদ্দেশ্য ভিন্ন। সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে রয়েছেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে। তিনি পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসে মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
অন্যদিকে, ইজরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল শ্লোমি বাইন্ডার পেন্টাগন ও সিআইএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করতে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় আমেরিকাকে সাহায্য করবে না। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ইরানের ওপর হামলার জন্য সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না।
কেন যুদ্ধ চাইছে না উপসাগরীয় দেশগুলো?
ইরান-আমেরিকা বা ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি, তেল সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায়।
- অর্থনৈতিক ঝুঁকি: সৌদি আরব, ইউএই, কাতার ও কুয়েতের মতো দেশগুলো তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ বাধলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চলে যাবে এবং সৌদির ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত হবে।
- ইরানের হুমকি: ইরান ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে, কোনো দেশ যদি আমেরিকাকে তাদের এয়ারবেস ব্যবহার করতে দেয়, তবে সেই দেশকেও হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
হরমোজ প্রণালীর সংকট
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ হয় হরমোজ প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধের ফলে ইরান যদি এই পথ বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এতে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলো।
তুরস্কের ভূমিকা ও সীমান্ত সতর্কতা
তুরস্কও এই যুদ্ধ রুখতে সক্রিয়। পশ্চিম এশিয়ায় বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে, যা তুরস্কের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে ৫৬০ কিমি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার পাশাপাশি তুরস্ক সীমান্তে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে। সীমান্তে ইতিমধ্যে ৩৮০ কিমি দীর্ঘ কংক্রিটের দেওয়াল ও ইলেকট্রো-অপটিক্যাল টাওয়ার বসিয়েছে দেশটি।
আমেরিকার অবস্থান
হোয়াইট হাউসের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। একদিকে তিনি ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, অন্যদিকে আলোচনার পথও খোলা রেখেছেন। সৌদি আরব ও তুরস্ক ভালোভাবেই জানে যে, এই যুদ্ধ এই অঞ্চলের কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। তাই তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

