স্বল্প সঞ্চয়ে ফের সেরার মুকুট বাংলার মাথায়, জমানো টাকার পাহাড়ে কুপোকাত মহারাষ্ট্র-উত্তরপ্রদেশও – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: সারা দেশে যখন সঞ্চয়ের ভাঁড়ারে টান পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের টাকা জমানোর প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে কেন্দ্র, ঠিক তখনই উল্টো স্রোতে হেঁটে নজির গড়ল পশ্চিমবঙ্গ। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের অধীনস্থ স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগের নিরিখে দেশের সমস্ত রাজ্যকে পিছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করে নিল বাংলা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের পরিসংখ্যান বলছে, আমানতের পরিমাণের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
টাকার অঙ্কে বাজিমাত বাংলার
ডাক বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গে স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলিতে জমা পড়েছে প্রায় ২ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা শিল্পসমৃদ্ধ মহারাষ্ট্রের সংগ্রহ ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, ১ লক্ষ ৫২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় স্তরে যেখানে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের হার কমছে, সেখানে বাংলার এই সাফল্য রাজ্যের সাধারণ মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা এবং সরকারি প্রকল্পের প্রতি আস্থারই প্রতিফলন।
কোন প্রকল্পে কত বিনিয়োগ
বাংলার মানুষের পছন্দের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে ‘মান্থলি ইনকাম স্কিম’ বা এমআইএস (MIS)। এই প্রকল্পে জমা পড়েছে ৬৬ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। বিনিয়োগের নিরিখে দ্বিতীয় জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ১ থেকে ৫ বছরের মেয়াদি আমানত বা ‘টাইম ডিপোজিট’, যেখানে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ৬০ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। এছাড়া রেকারিং ডিপোজিটে ১৪ হাজার ১০৯ কোটি এবং পিপিএফে (PPF) জমা পড়েছে ৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।
অ্যাকাউন্ট সংখ্যায় টেক্কা দিল তামিলনাড়ু
টাকার অঙ্কে বাংলা সেরা হলেও, কতগুলি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে সেই নিরিখে বিচার করলে শীর্ষস্থানটি দখল করেছে দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ু। সেখানে মোট স্বল্প সঞ্চয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা উত্তরপ্রদেশে এই সংখ্যা ৩ কোটি ১৩ লক্ষ। পশ্চিমবঙ্গ ২ কোটি ২১ লক্ষ ৬২ হাজার অ্যাকাউন্ট নিয়ে এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকলেও একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। এখানে অ্যাকাউন্ট পিছু গড় সঞ্চয়ের পরিমাণ অন্য যে কোনও রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ, কম সংখ্যক অ্যাকাউন্টেও বেশি টাকা জমিয়ে সেরার শিরোপা ধরে রেখেছে বাংলা।
এজেন্টদের ভূমিকা ও ক্ষোভ
রাজ্যে স্বল্প সঞ্চয়কে জনপ্রিয় করার নেপথ্যে এজেন্টদের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে রেকারিং ডিপোজিটের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মহিলারাই এজেন্ট হতে পারেন এবং সেখানে কমিশনের হার ৪ শতাংশ। তবে এজেন্টদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভও দানা বাঁধছে। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে কেন্দ্র সঞ্চয় কমা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অথচ অন্যদিকে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা বা পিপিএফ-এর মতো জনমুখী প্রকল্পগুলি থেকে কমিশন প্রথা তুলে দেওয়া হয়েছে। এজেন্টদের দাবি, সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে গেলে শুধু সুদের হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, এজেন্টদের প্রাপ্য কমিশনের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যবৃদ্ধির বাজারেও বাঙালির এই সঞ্চয় বিলাস প্রমাণ করে যে, অনিশ্চিত শেয়ার বাজারের চেয়ে নিরাপদ সরকারি বিনিয়োগেই এখনও বেশি ভরসা রাখছে পূর্ব ভারত।

