১৯৬৬: যখন মার্কিন চাপে নতিস্বীকার করেছিলেন ভারতের ‘লৌহমানবী’, পড়েছিল টাকার দাম – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
অধিকাংশ ভারতীয়র কাছেই এই তথ্যটি অজানা যে, একসময় ভারতীয় টাকা কেবল আমাদের দেশের মুদ্রাই ছিল না। কাঠমান্ডু থেকে কুয়েত, পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে ভারতের টাকাই ছিল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। মার্কিন ডলার বিশ্ব জয় করার অনেক আগেই ভারতীয় রুপি বিশ্ব বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
রুপির হারানো গৌরব
সোনা চোরাচালান রুখতে ভারত সেই সময় ‘গালফ রুপি’ (Gulf Rupee) নামে একটি বিশেষ মুদ্রা চালু করেছিল। লাল রঙের এবং ‘Z’ প্রিফিক্সযুক্ত এই রুপি সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কাতার, ওমান, বাহরাইন এবং কুয়েতে সরকারি মুদ্রা হিসেবে প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ সেই সময় ভারত ছিল এক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি। এমনকি কেনিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার মতো পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোও ভারতীয় রুপির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কোনো যুদ্ধ বা সামরিক শক্তি ছাড়াই ভারতীয় মুদ্রা আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেছিল। কিন্তু ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেওয়া একটি সিদ্ধান্তে এই সবকিছুর অবসান ঘটে।
১৯৬৬: একটি সিদ্ধান্ত এবং বদলে যাওয়া ইতিহাস
১৯৬৬ সালের এক সকালে ভারতীয়রা ঘুম থেকে উঠে জানতে পারেন যে তাঁদের মুদ্রার মান পড়ে গিয়েছে। কোনো প্রকাশ্য আলোচনা ছাড়াই ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময় মূল্য ৪.৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭.৫০ টাকা করা হয়।
- চাপ: সেই সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাস হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর। দেশ তখন চরম খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আমেরিকা, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ (IMF)-এর কাছ থেকে সাহায্য পেতে হলে রুপির অবমূল্যায়ন করতে হবে—এমনই শর্ত দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
- আস্থা হারানো: দিল্লির শাসকরা ভেবেছিলেন অবমূল্যায়নের ফলে বিদেশি সাহায্য আসবে, কিন্তু এর ফলে গালফ দেশগুলো ভারতের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। বিদেশি চাপে পড়ে যারা নিজেদের মুদ্রার মান কমিয়ে দেয়, এমন দেশকে বিশ্বাস করা কঠিন—এই যুক্তিতে গালফ দেশগুলো নিজেদের মুদ্রা চালু করে এবং ডলারের সাথে তা যুক্ত করে নেয়।
প্রভাব ও পরিণতি
এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারত তার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারায়। ইন্দিরা গান্ধী পরবর্তীকালে একজন শক্তিশালী নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও, ১৯৬৬ সালের এই সিদ্ধান্ত রুপির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছিল। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক সংস্কার হলেও রুপি তার পুরনো গৌরব এবং গালফ দেশগুলোর ওপর সেই নিয়ন্ত্রণ আর ফিরে পায়নি। ততদিনে ডলার বিশ্ব অর্থনীতি দখল করে নিয়েছে।

