মস্তিষ্কের গঠন: মটর দানার আকারের এই গ্রন্থিটি ঠিক কী কাজ করে? – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
মানবদেহ এক বিস্ময়কর যন্ত্র, যেখানে প্রতিটি অঙ্গ নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মস্তিষ্কের ঠিক মাঝখানে থাকা মটর দানার আকারের একটি ক্ষুদ্র গ্রন্থি আমাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একে বলা হয় ‘পাইনিয়াল গ্রন্থি’। প্রাচীনকাল থেকেই একে মানুষের ‘তৃতীয় নয়ন’ (Third Eye) হিসেবে অভিহিত করা হয়। আমাদের মানসিক অবস্থা ও শরীরের ওপর এই গ্রন্থির প্রভাব অত্যন্ত চমকপ্রদ।
পাইনিয়াল গ্রন্থির প্রধান কাজ
এই গ্রন্থির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘মেলাটোনিন’ (Melatonin) নামক হরমোন তৈরি করা। এটি আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ (Circadian Rhythm) নিয়ন্ত্রণ করে। অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ঘুম পাওয়া এবং ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পেছনে এই হরমোনই দায়ী। রাতে এই গ্রন্থিটি সক্রিয় হয়ে মেলাটোনিন নিঃসরণ করে, যা আমাদের গভীর ঘুমে সাহায্য করে।
পাইনিয়াল গ্রন্থি কেবল ঘুম নয়, আমাদের মেজাজ বা ‘মুড’ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। মেলাটোনিনের মাত্রা কমে গেলে মানুষ মানসিক চাপ ও উদ্বেগে ভুগতে পারে। এটি পরোক্ষভাবে ‘সেরোটোনিন’ নামক হরমোন তৈরিতেও সাহায্য করে। মন শান্ত ও ফুরফুরে রাখতে এই গ্রন্থির সঠিক কার্যকারিতা অপরিহার্য। এর অনিয়ম হলে অনিদ্রা ও মানসিক অবসাদের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শরীরের অন্যান্য হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতেও পাইনিয়াল গ্রন্থি গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি এবং শেখার ক্ষমতা বাড়াতে এটি সহায়ক। মস্তিষ্কের কোষের পুনর্গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সচল রাখতে এর অবদান অনস্বীকার্য।
মেলাটোনিন কমে গেলে কী হয়?
বর্তমান যুগে স্মার্টফোন এবং কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (Blue Light) পাইনিয়াল গ্রন্থির কাজের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। রাতে দীর্ঘক্ষণ কৃত্রিম আলোয় থাকার ফলে মেলাটোনিন উৎপাদন কমে যায়। এতে ঘুমের সমস্যা হয়, যার ফলে সারাদিন ক্লান্তি ভাব এবং মনোযোগের অভাব দেখা দেয়।
এই গ্রন্থিকে সুস্থ রাখবেন কীভাবে?
- প্রাকৃতিক আলো: প্রতিদিন সকালে কিছুটা সময় রোদে কাটান, এতে গ্রন্থিটি সচল থাকে।
- অন্ধকারে ঘুমানো: রাতে ঘুমানোর সময় ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার রাখার চেষ্টা করুন।
- গ্যাজেট থেকে দূরত্ব: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বা ল্যাপটপ দূরে সরিয়ে রাখুন।
- পুষ্টিকর খাবার: ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার এই গ্রন্থির কার্যকারিতা বাড়ায়।
আকারে ক্ষুদ্র হলেও পাইনিয়াল গ্রন্থির কাজ অত্যন্ত বিশাল। এটি আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ভিত্তি। সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে এই গ্রন্থির যত্ন নিলে আমরা সর্বদা প্রাণবন্ত থাকতে পারি। আধ্যাত্মিক দিক থেকেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে; বলা হয় এটি আমাদের অন্তরাত্মা ও বাহ্যিক জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। তাই মস্তিষ্কের এই ক্ষুদ্র শক্তি কেন্দ্রটিকে সুরক্ষিত রাখা আমাদেরই দায়িত্ব।

