লেটেস্ট নিউজ

জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এক অনন্য নারীর দেশ, যেখানে পুরুষদের ছায়াও নিষিদ্ধ, শুধুমাত্র এই পরিস্থিতিতেই সেখানে প্রবেশ সম্ভব – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

নয়াদিল্লি: আধুনিক বিশ্বের কোলাহল থেকে দূরে আমেরিকার অরেগন অঙ্গরাজ্যের দুর্গম পাহাড় আর ঘন জঙ্গলের মাঝে গড়ে উঠেছে এক অন্যরকম দুনিয়া। এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়, বরং বাস্তবের এক ‘গোপন সংসার’—যাকে বলা হয় ‘উইমেনস ল্যান্ড’ (Women’s Land)। ১৯৭০-এর দশক থেকে চলে আসা এই বৈপ্লবিক জনপদে পুরুষদের আধিপত্য তো দূরের কথা, তাদের ছায়াও মাড়ানো নিষেধ।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বেড়াজাল ছিঁড়ে প্রকৃতির কোলে এক স্বনির্ভর ‘রাজত্ব’ কায়েম করেছেন এই মহিলারা। এখানে না আছে বিদ্যুতের কৃত্রিম আলো, না আছে শহরের যান্ত্রিকতা। এখানে কেবল ‘সিস্টারহুড’ বা ভাতৃত্ববোধ এবং আত্মনির্ভরতার রাজত্ব চলে। ঘর বানানো থেকে শুরু করে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা—সব কাজই এখানে মহিলারা নিজেদের হাতে করেন।

নারীবাদের এক অনন্য নজির: উইমেনস ল্যান্ড

১৯৭০ ও ৮০-র দশকে যখন সারাবিশ্বে নারীবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদ (Feminist Separatism) জোরালো হচ্ছিল, তখন একদল নারী অরেগনের নির্জন ভূমিকে নিজেদের ঠিকানা হিসেবে বেছে নেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে এক বিকল্প সভ্যতা গড়ে তোলা। বর্তমানে ‘রুটওয়ার্কস’ এবং ‘উই উইমেন’-এর মতো গোষ্ঠীগুলো সেই আধ্যাত্মিক এবং আদর্শগত আশ্রয়স্থল হিসেবে টিকে আছে।

এখানে পুরুষদের জন্য বরাদ্দ কাজ বলে পরিচিত কাঠ কাটা বা লাঙল চালানোর মতো কঠিন পরিশ্রমের কাজগুলো মহিলারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেন। সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জলর ব্যবস্থা করার মতো কারিগরি কৌশলও তারা নিজেরাই রপ্ত করেছেন।

সাম্য এবং কঠোর নিয়মাবলি

মহিলাদের এই সমাজে উঁচু-নিচুর কোনো ভেদাভেদ নেই। নতুন সদস্য গ্রহণ থেকে শুরু করে শীতের রেশন জোগাড়—যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রতিটি সদস্যের সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক। যতক্ষণ না সবাই একমত হচ্ছেন, ততক্ষণ কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না। এছাড়া বাইরের দুনিয়ার হস্তক্ষেপ রুখতে এখানে ফোন ব্যবহার বা ছবি তোলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এখানে থাকার শর্ত কী?

এই অনন্য সমাজে ঠাঁই পাওয়া সহজ নয়। এখানে থাকার জন্য অর্থের চেয়ে ‘সময় ও শ্রম’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • পরিদর্শক থেকে স্থায়ী বাসিন্দা: শুরুতে ইচ্ছুক মহিলাদের ‘ভিজিটর’ হিসেবে আসতে হয়। দীর্ঘদিনের পুরনো সদস্যরা যদি তাদের চিন্তাধারায় সন্তুষ্ট হন, তবেই সেখানে থাকার অনুমতি মেলে।
  • শারীরিক শ্রম বাধ্যতামূলক: শীতের জন্য কাঠ সংগ্রহ বা চাষাবাদ—প্রত্যেক সদস্যকে কঠিন শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। এখানে আয়েশ করার কোনো সুযোগ নেই।
  • ডিজিটাল ডিটক্স: গোপনীয়তা রক্ষায় এখানে ক্যামেরা বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ। ‘নো-মেন’ পলিসি বা পুরুষহীন নীতি এখানকার সর্বোচ্চ আইন।

বর্তমান পরিস্থিতি

বর্তমানে এই জনপদগুলোতে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০-র মধ্যে হলেও, প্রতি বছর বিভিন্ন কর্মশালা বা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশ্বের হাজার হাজার নারী এখানে আসেন। যদিও আর্থিক সংকট ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক বসতি বন্ধ হয়ে গেছে, তবুও টিকে থাকা গোষ্ঠীগুলো আজও পরিবেশবাদী নারীবাদের (Ecofeminism) মূর্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাইরে এক ন্যায়বিচারপূর্ণ এবং বিকল্প জীবন খুঁজছেন, তাদের কাছে এই ‘উইমেনস ল্যান্ড’ আজও এক পরম অনুপ্রেরণা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *