আধুনিক প্রযুক্তিকেও হার মানাবে ভারতের এই ৭টি মন্দির! অবাক করা স্থাপত্যের রহস্য জানলে চমকে যাবেন – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
February 21, 202611:32 am
ভারতের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এমন কিছু স্থাপত্য যা আধুনিক যুগের ইঞ্জিনিয়ারদের কাছেও এক মস্ত বড় ধাঁধা। আজকের উন্নত প্রযুক্তির যুগে যখন একটি বহুতল তৈরি করতে কালঘাম ছুটে যায়, তখন হাজার বছর আগে কোনো ক্রেন বা আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই অবিশ্বাস্য সব মন্দির? ডেইলহান্ট-এর বিশেষ প্রতিবেদনে দেখে নিন ভারতের সেই সব স্থাপত্যের বিস্ময় যা আজও মানুষকে ভাবিয়ে তোলে।
পাথর কেটে উল্টো নির্মাণ ইলোরার কৈলাস মন্দির
সাধারণত কোনো ভবন নিচ থেকে ওপরের দিকে তৈরি করা হয়। কিন্তু মহারাষ্ট্রের ইলোরা গুহার কৈলাস মন্দির তৈরি হয়েছে ঠিক উল্টো পদ্ধতিতে। ওপরের পাহাড়ের একটি আস্ত পাথর কেটে নিচ পর্যন্ত খোদাই করে তৈরি হয়েছে এই বিশাল মন্দির। ৩৪টি গুহা মন্দিরের মধ্যে এটিই বৃহত্তম। কোনো জোড়াাতালি নেই, কেবল একটিমাত্র নিরেট পাথরকে কেটে এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন তৎকালীন স্থপতিরা। যা বর্তমান যুগের আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার কাছেও এক চরম বিস্ময়।
থাঞ্জাভুরের বৃহদেশ্বর মন্দির এবং ৮০ টনের রহস্য
তামিলনাড়ুর এই মন্দিরটি এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। প্রায় ২১৬ ফুট উঁচু এই মন্দিরের চূড়ায় একটি বিশাল পাথরের খণ্ড বসানো রয়েছে যার ওজন প্রায় ৮০ টন। সেই সময় কোনো ক্রেন বা লিফট ছিল না। শোনা যায়, কেবল এই পাথরটি চূড়ায় তোলার জন্য প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ঢালু পথ বা র্যাম্প তৈরি করা হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ এবং হাতির সাহায্যে এই অসাধ্য সাধন করা হয়েছিল কেবল রাজার অটল বিশ্বাসের জোরে।
মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দির ও ৩৩ হাজার ভাস্কর্য
তামিলনাড়ুর ভাইগাই নদীর তীরে অবস্থিত ২০০০ বছরের পুরনো এই মন্দিরটি দ্রাবিড় স্থাপত্যের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। দেবী মীনাক্ষী ও ভগবান সুন্দরেশ্বরকে উৎসর্গ করা এই মন্দিরে রয়েছে ১৪টি বিশাল গোপুরম বা প্রবেশদ্বার। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মন্দির চত্বরে প্রায় ৩৩,০০০-এরও বেশি সূক্ষ্ম ও জটিল ভাস্কর্য রয়েছে। প্রতিটি ইঞ্চিতে খোদাই করা শিল্পকর্ম আজও জীবন্ত বলে মনে হয়।
কোনারকের সূর্য মন্দির যা নিখুঁত সময় বলে দেয়
ওড়িশার কোনারক মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে সূর্য দেবতার রথের আকারে। এই মন্দিরের চাকাগুলো কেবল শোভাবর্ধক নয়, এগুলো এক একটি নিখুঁত সূর্যঘড়ি। বছরের যে কোনো সময় সূর্যের আলোর অবস্থান দেখে এই চাকাগুলো নির্ভুলভাবে সময় বলে দিতে পারে। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মন্দিরটি প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিকতা কেবল বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং গভীর বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
লেপাক্ষী মন্দিরের ঝুলন্ত স্তম্ভ
অন্ধ্রপ্রদেশের লেপাক্ষী মন্দিরে গেলে দেখা যায় এক অলৌকিক দৃশ্য। এই মন্দিরের একটি স্তম্ভ মাটির সঙ্গে লেগে নেই, বরং শূন্যে ঝুলে রয়েছে। পর্যটকরা এই স্তম্ভের তলা দিয়ে অনায়াসেই কাপড়ের টুকরো বা কাগজ গলিয়ে দিতে পারেন। ১৬ শতকের বিজয়নগর স্থাপত্যের এই বিস্ময় কেন বা কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল, তা নিয়ে আজও গবেষকদের মধ্যে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ বলেন এটি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারিশমা, আবার ভক্তদের কাছে এটি দেবতার অলৌকিক মহিমা।
রনকপুরের জৈন মন্দির এবং ১৪৪৪টি অনন্য স্তম্ভ
রাজস্থানের রনকপুর জৈন মন্দিরটি তার সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। এই মন্দিরে মোট ১৪৪৪টি মার্বেল পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই ১৪৪৪টি স্তম্ভের একটির সঙ্গে অন্যটির নকশার কোনো মিল নেই। প্রতিটি স্তম্ভ আলাদাভাবে খোদাই করা হয়েছে। ১৫ শতকে নির্মিত এই মন্দিরটি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য মহাকাব্য।
রামেশ্বরম মন্দির নোনা হাওয়ায় অটুট আভিজাত্য
তামিলনাড়ুর সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপে অবস্থিত এই মন্দিরটি ভারতের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম। সমুদ্রের নোনা বাতাস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও এই সুবিশাল স্থাপত্য শত শত বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর দীর্ঘতম করিডোর এবং সুউচ্চ গোপুরমগুলো প্রাচীন ভারতের উন্নত নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্য বহন করছে।
এই মন্দিরগুলো কেবল উপাসনালয় নয়, বরং এগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং উন্নত বিজ্ঞানের জীবন্ত প্রমাণ। আধুনিক সভ্যতা যতই এগিয়ে যাক, এই প্রাচীন আশ্চর্যগুলোর সামনে দাঁড়ালে আজও মাথা নত হয়ে আসে।

