আতপ নাকি সিদ্ধ? কোন চালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘায়ু হওয়ার গোপন চাবিকাঠি – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ভাত বাঙালির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ভাতের পাতে আমরা কোন চাল বেছে নিচ্ছি, তার ওপর নির্ভর করে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা। সাধারণ এক থালা ভাতের পেছনে লুকিয়ে থাকে ধান থেকে চাল তৈরির এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা নির্ধারণ করে দেয় আপনি কতটা পুষ্টি পাচ্ছেন। পুষ্টিবিদদের সাম্প্রতিক গবেষণা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আতপ এবং সিদ্ধ চালের মধ্যে লড়াইয়ে দাবার চালে এগিয়ে রয়েছে সিদ্ধ চাল। কেন এই চাল আপনার শরীরের জন্য মহৌষধের মতো কাজ করতে পারে, তা গভীরে গিয়ে বোঝা প্রয়োজন।
পুষ্টির আসল আধার কোন চাল
ধান থেকে সরাসরি তুষ ছাড়িয়ে যে চাল তৈরি হয়, তা হলো আতপ। অন্যদিকে, ধানকে প্রথমে জলে ভিজিয়ে হালকা ভাপে সেদ্ধ করে তারপর শুকিয়ে যে চাল পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় সিদ্ধ চাল। এই সামান্য ভাপ দেওয়ার প্রক্রিয়াটিই চালের গুণমানে আকাশ-পাতাল পার্থক্য গড়ে দেয়। ভাপ দেওয়ার সময় ধানের খোসা বা তুষে থাকা ভিটামিন বি, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফাইবার সরাসরি চালের ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে সিদ্ধ চাল হয়ে ওঠে খনিজ উপাদানে ঠাসা এক পাওয়ার হাউস। অন্যদিকে, আতপ চাল পালিশ করার সময় এর উপরিভাগের অধিকাংশ পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়, যা একে কেবল শর্করার একটি উৎস হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখে।
ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিকের মতো কাজ
আধুনিক জীবনযাত্রায় ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা এক বড় অভিশাপ। আপনি যদি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তবে সিদ্ধ চাল আপনার জন্য রক্ষাকবচ হতে পারে। সিদ্ধ চালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) অনেক কম, যার অর্থ হলো এটি খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যায় না। এতে থাকা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ হজম হতে সময় নেয়, ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে এবং আজেবাজে খাওয়ার প্রবণতা কমে। এর বিপরীতে, আতপ চাল খুব দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
হজমশক্তি ও পাকস্থলীর স্বাস্থ্যের সমীকরণ
হজমের সমস্যার কথা মাথায় রাখলে আতপ চালের একটি বিশেষ গুণ রয়েছে। এটি অত্যন্ত হালকা এবং নরম হওয়ায় পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে না। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা যারা পেটের গোলমালে ভুগছেন, তাদের জন্য আতপ চালের জাউ বা নরম ভাত বেশ আরামদায়ক। তবে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জন্য সিদ্ধ চালই সেরা, কারণ এতে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রেও সিদ্ধ চালের ফাইবার রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
সেরা চাল বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত গাইডলাইন
আপনার লাইফস্টাইল অনুযায়ী চাল নির্বাচন করুন নিচের সহজ উপায়ে:
- দৈনন্দিন আহার: সাধারণ সুস্থ শরীরের জন্য সিদ্ধ চালই হোক আপনার প্রধান পছন্দ। এটি শরীরের প্রয়োজনীয় খনিজ ও ভিটামিনের জোগান নিশ্চিত করবে।
- বিশেষ খাবারের স্বাদ: বিরিয়ানি, পোলাও, পায়েস বা পিঠা তৈরির জন্য আতপ চালের কোনো বিকল্প নেই। এর সুগন্ধ এবং আঠালো ভাব খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
- অসুস্থ অবস্থায়: যদি আপনি তীব্র গ্যাস বা হজমের সমস্যায় ভোগেন, তবে সাময়িকভাবে আতপ চালের ভাত খেতে পারেন। কিন্তু রোগমুক্ত হওয়ার পর পুনরায় সিদ্ধ চালে ফিরে আসাই বুদ্ধিমানির কাজ।
পরিশেষে বলা যায়, কেবল রসনা তৃপ্তি নয়, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিন সচল রাখতে সিদ্ধ চালের কোনো বিকল্প নেই। আপনি যদি দীর্ঘস্থায়ী সুস্থতা এবং মেদহীন শরীর চান, তবে আজই আপনার চালের কৌটোয় বদল আনুন। সঠিক চাল নির্বাচনই হতে পারে আপনার সুস্থ থাকার প্রথম পদক্ষেপ।

