যুদ্ধের দাবানলে জ্বলছে সীমান্ত, আফগানিস্তানের তিন শহরে পাকিস্তানের ভয়াবহ বিমান হামলা – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নিউজ ডেস্ক :
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবার সরাসরি যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। শুক্রবার ভোরে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কান্দাহার ও পাক্তিকা প্রদেশে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এই হামলার পরপরই সীমান্তজুড়ে শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। তালেবান সরকার দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সীমান্ত চেকপোস্ট দখল করে নিয়েছে। দুই দেশই এখন একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সরাসরি যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে।
মধ্যরাতে প্রকম্পিত কাবুল: কী ঘটেছিল সেই মুহূর্তে?
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদ সংস্থা এএফপি-র তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে কাবুল শহর। আকাশের বুক চিরে যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং দফায় দফায় বিস্ফোরণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ। রাত ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গুলির শব্দ শোনা যায়। পাকিস্তানের দাবি, তারা আফগান ভূখণ্ডে থাকা জঙ্গি আস্তানা ও তালেবানের প্রতিরক্ষা ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই ‘অপারেশন’ চালিয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, এই হামলায় ১৩৩ জন তালেবান সদস্য নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছে।
রণক্ষেত্র সীমান্ত: নিহতের সংখ্যা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার পাকিস্তানের এই আক্রমণকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা পাকিস্তানের হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছে। তাদের অভিযানে অন্তত ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করা হয়েছে। যদিও পাকিস্তান তাদের মাত্র দুইজন সৈন্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, পাকিস্তান বেসামরিক এলাকায় হামলা চালালেও তারা বীরত্বের সঙ্গে সীমানা রক্ষা করছেন।
‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে’—পাকিস্তানের চরম হুঁশিয়ারি
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করে লিখেছেন, “আমরা অনেক ধৈর্য ধরেছি, কূটনীতি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ হবে।” পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফও অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তাদের স্পষ্ট বার্তা—পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বে আঘাত করলে কেউ রেহাই পাবে না।
নেপথ্যে গত সপ্তাহের আত্মঘাতী হামলা
উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল গত ২২শে ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের ভূখণ্ডে একটি আত্মঘাতী বিস্ফোরণের পর ইসলামাবাদ দাবি করে, ওই হামলার পরিকল্পনা আফগানিস্তানের মাটি থেকে করা হয়েছিল। এর জবাবে পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় সাতটি জঙ্গি আস্তানায় হামলা চালায়। অন্যদিকে, তালেবান দাবি করে পাকিস্তান সাধারণ মানুষের বাড়ি এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোমা ফেলেছে, যেখানে নারী ও শিশুরাও প্রাণ হারিয়েছে। সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই বৃহস্পতিবার রাতে তালেবানরা সীমান্ত চেকপোস্টে হামলা চালায়, যার চরম পরিণতি হিসেবে শুক্রবার ভোরে কাবুলসহ তিন শহরে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আফগানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই প্রতিবেশী দেশের এই সংঘাত যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারে। বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় দুই দেশেরই ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

