ইরান ইস্যুতে বেজিংয়ের রহস্যময় নীরবতা কি আসলে বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
পশ্চিম এশিয়ায় ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চরম আকার নিয়েছে। মার্কিন মদতে ইজরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ইরান যখন পালটা প্রত্যাঘাতের পথে হাঁটছে, তখন বিশ্বের অন্যতম মহাশক্তি চিনের ভূমিকা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। বেজিংয়ের এই ‘কৌশলগত নীরবতা’ কি কেবলই নিরপেক্ষতা, নাকি এর পিছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো অর্থনৈতিক হিসেব?
রণক্ষেত্র পশ্চিম এশিয়া এবং ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইজরায়েলের ‘রোয়ারিং লায়ন’ অভিযানে কার্যত কোণঠাসা ইরান। তেহরান থেকে ইসফাহান— ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো এখন ধ্বংসস্তূপ। পালটা জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে মিসাইল বৃষ্টি করেছে। দুবাইসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিস্ফোরণের জেরে থমকে গেছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা।
ড্রাগনের মাপা চাল: তেল না কি কূটনীতি
চিন কেন চুপ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রধান কারণ হলো ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’। ইরানের তেলের ৮০ শতাংশেরই ক্রেতা চিন। প্রতিদিন প্রায় ১৩.৮ লক্ষ ব্যারেল তেল ইরান থেকে সমুদ্রপথে বেজিংয়ে পৌঁছায়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হতেই চিন অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ইরান থেকে আমদানি কমিয়ে রাশিয়ার সস্তা তেলের দিকে ঝুঁকেছে। অর্থাৎ, বন্ধুত্বের চেয়েও চিনের কাছে নিজের দেশের তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা বেশি জরুরি।
ইরানের ‘ঐতিহাসিক ভুল’ ও চিনের অস্বস্তি
কূটনীতি বিশেষজ্ঞ বালাকৃষ্ণনের মতে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ইরান এক মস্ত বড় কৌশলগত ভুল করে ফেলেছে। এতে চিন কেবল অস্বস্তিতেই পড়েনি, বরং ইরানের ওপর বেজিংয়ের যে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) ছিল, তাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আরব দেশগুলোর সঙ্গে চিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, তাই ইরানের এই পদক্ষেপে বেজিং সরাসরি পক্ষ নিতে পারছে না।
হরমুজ প্রণালী: চিনের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা
চিনের ৪৪ শতাংশ তেল আসে আরব দুনিয়া থেকে, যা মূলত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনটা হলে চিনের শিল্প উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়বে, যা বেজিং কোনোভাবেই হতে দিতে চায় না।
চিনের নীরবতা আসলে এক ‘হিসেবি অপেক্ষা’
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের চিনকে যতটা প্রয়োজন, চিনের ইরানকে ততটা নয়। চিন বর্তমানে এক অদ্ভুত দোটানায় রয়েছে। একদিকে তারা যুদ্ধের নিন্দা করছে, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে নিজেদের তেলের জোগান নিশ্চিত করছে। চিনের এই নীরবতা আসলে নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা দেখার জন্য এক গভীর অপেক্ষার কৌশল।

