ইরানের পাশে ভারত, দিল্লি থেকে গেল ২০,০০০ কেজি জীবনদায়ী ওষুধ!

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মাঝে ‘মেডিসিন ডিপ্লোমেসি’, ভারতের কৌশলী পদক্ষেপে ইরানের সঙ্গে নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে নজির তৈরি করল ভারত। যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত ইরানের সাধারণ মানুষ এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য দিল্লি থেকে বিপুল পরিমাণ জীবনদায়ী ওষুধ পাঠানো হয়েছে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন মানবিক সম্প্রীতির বার্তা বহন করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারতের নতুন কূটনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মানবিক সহায়তায় বড় পদক্ষেপ ভারতের
ইরানের রাজধানী তেহরানে ভারতের পক্ষ থেকে প্রায় ২০ হাজার কেজি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বোঝাই একটি বিমান পাঠানো হয়েছে। এর আগেও সমুদ্রপথে ৪৫ হাজার কেজি ওষুধ সরবরাহ করেছে ভারত। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই ‘মেডিসিন ডিপ্লোমেসি’ মূলত একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। এই পথে চলাচলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় যে জটিলতা তৈরি হয়, তা কমানোর লক্ষ্যেই দিল্লি এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নজিরবিহীন সমঝোতা
ভারত ও ইরানের এই সমঝোতার ফলও মিলতে শুরু করেছে অত্যন্ত দ্রুত। ভারতের মানবিক সহায়তার প্রতিদান হিসেবে তেহরান বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে। ইরানের দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখন থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী কোনো ভারতীয় জাহাজ আটকানো হবে না এবং তাদের ওপর কোনো ধরনের বাড়তি টোল বা শুল্ক আরোপ করা হবে না। এই সিদ্ধান্ত ভারতের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথকে আরও নির্বিঘ্ন করবে। এছাড়াও, ভারতের পক্ষ থেকে ইরানকে ১ লক্ষ ইউরো আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
যদিও ভারত ও ইরানের সম্পর্ক উষ্ণ হচ্ছে, তবুও বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও চিন্তার কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ জারি রয়েছে, যা ভারতের জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে ১৫টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। ইরান-চীন সম্পর্কে কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না বলে চীন কড়া বার্তা দিয়েছে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সাত বছর পর ইরান থেকে আবার অপরিশোধিত তেল আমদানি শুরু করেছে ভারত। ‘ফেলিসিটি’ এবং ‘জয়া’ নামক দুটি ট্যাংকার প্রায় চার মিলিয়ন ব্যারেল তেল নিয়ে যথাক্রমে গুজরাটের সিক্কা এবং ওড়িশার পারাদ্বীপ বন্দরে নিরাপদেই নোঙর করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে ভারত যেভাবে মানবিক ও নিভৃত কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর, যার দিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
এক ঝলকে
- মানবিক সহায়তা: ইরানকে মোট ৬৫ হাজার কেজি জীবনদায়ী ওষুধ পাঠিয়েছে ভারত।
- কৌশলী সুবিধা: হরমুজ প্রণালীতে ভারতীয় জাহাজ চলাচলে টোল ও তল্লাশি বাতিল করেছে ইরান।
- আর্থিক অনুদান: সম্পর্কের দৃঢ়তা বাড়াতে ইরানকে ১ লক্ষ ইউরো অনুদান ভারতের।
- জ্বালানি আমদানি: সাত বছর পর ইরান থেকে প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ভারতের বন্দরে পৌঁছেছে।
- ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি: মার্কিন নেতৃত্বাধীন নৌ-অবরোধ এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও অস্থির।
