সেলাই শেখানোর ফাঁদে ৭০ হাজারে বিক্রি, নিখোঁজ তরুণীর অপেক্ষায় দিশেহারা পরিবার!

বিহারের দর্ভাঙ্গায় মানব পাচারের ভয়াবহ সিন্ডিকেট: একজনের উদ্ধার, অন্যজনের সন্ধানে প্রশাসন
বিহারের দর্ভাঙ্গা জেলায় মানব পাচারের একটি শক্তিশালী ও নিষ্ঠুর সিন্ডিকেটের পর্দাফাঁস হয়েছে। ভালপট্টি থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া দুই কিশোরীকে সেলাই শেখানোর নামে প্রলুব্ধ করে পশ্চিমবঙ্গের রেড লাইট এরিয়ায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এই ঘটনা গ্রামীণ ভারতের কিশোরীদের নিরাপত্তা এবং পাচারকারী চক্রের ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
পাচার চক্রের নেপথ্যে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র
২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি ভালপট্টি এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয় দুই কিশোরী। তদন্তে উঠে এসেছে, তস্কররা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সেলাই প্রশিক্ষণের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বাড়ি থেকে সরিয়ে আনে। মুজাফফরপুর ও মোতিহারি হয়ে তাদের পশ্চিমবঙ্গে পাচার করা হয়। মোতিহারিতে এক নারী মাত্র ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে এক কিশোরীকে পূর্ণিয়ার বাসিন্দা মহম্মদ সাইফুদ্দিনের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীকালে, সাইফুদ্দিন ওই কিশোরীকে উত্তর দিনাজপুরের পাঞ্জিপাড়া এলাকার এক নিষিদ্ধ পল্লীতে চড়া দামে বিক্রি করে দেয়।
পুলিশি তৎপরতা ও উদ্ধার অভিযান
গত ১৫ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের গোয়ালপোখর থানার পুলিশ একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। পাঞ্জিপাড়ার নিষিদ্ধ পল্লী থেকে বিহারের দর্ভাঙ্গা, পাটনা এবং উত্তরপ্রদেশের মোট তিন কিশোরীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এই ঘটনায় হাফিজা খাতুন, মহম্মদ শাহজাহান, মহম্মদ সাজ্জাদ এবং মহম্মদ সাইফুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের বিরুদ্ধে অপহরণ, পকসো (POCSO) আইন এবং মানব পাচারের সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
বিচার ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
১৬ অক্টোবর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির সহায়তায় উদ্ধার হওয়া এক কিশোরী বাড়িতে ফিরলেও, অন্যজন এখনও নিখোঁজ। ভুক্তভোগী পরিবার প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বিচারের আশায় দিন গুনছে। অভিযোগ উঠেছে, দর্ভাঙ্গা পুলিশ এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধৃত আসামিদের রিমান্ডে আনার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এ ধরনের ঢিলেমি পাচার চক্রের মূল হোতাদের আড়াল করছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। যদিও ভালপট্টি থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ধর্মানন্দ কুমার দাবি করেছেন, তদন্ত চলছে এবং খুব শীঘ্রই একটি বিশেষ দল তদন্তের প্রয়োজনে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হবে।
মানব পাচারের প্রভাব ও বিশ্লেষণ
এই ঘটনা গ্রামীণ এলাকায় অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাবকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা অপরাধী চক্রের সক্রিয়তাকে স্পষ্ট করে। দর্ভাঙ্গা ও উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে পাচারকারীরা নিজেদের ‘নিরাপদ করিডোর’ হিসেবে ব্যবহার করছে। আন্তঃরাজ্য পুলিশের সমন্বয়ের অভাব অপরাধীদের কাজ সহজ করে দিচ্ছে। নিখোঁজ দ্বিতীয় কিশোরীকে দ্রুত উদ্ধার করতে না পারলে, তার জীবনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক ঝলকে
- ঘটনার সূত্রপাত: ১৩ জানুয়ারি ২০২৫, দর্ভাঙ্গার ভালপট্টি থানা এলাকা থেকে।
- অবলম্বিত কৌশল: সেলাই কাজ শেখানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলোভন।
- পাচারের রুট: দর্ভাঙ্গা থেকে মুজাফফরপুর ও মোতিহারি হয়ে পশ্চিমবঙ্গ।
- বিক্রির আর্থিক অংক: এক কিশোরীকে মাত্র ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়।
- পুলিশি অভিযান: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, উত্তর দিনাজপুরের পাঞ্জিপাড়া রেড লাইট এরিয়া থেকে উদ্ধার।
- বর্তমান পরিস্থিতি: একজন উদ্ধার হলেও অন্য এক কিশোরীর কোনো হদিস মেলেনি, ধৃত ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু।
