নববর্ষ মানেই ছিল প্রতীক্ষা, পুরোনো সেই গানের আসর বড় মিস করেন হৈমন্তী!

নববর্ষের আমেজ কি হারিয়ে যাচ্ছে? স্মৃতিচারণায় নস্টালজিক হৈমন্তী শুক্লা

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ এক সময় ছিল অদ্বিতীয়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে সনাতন এই উৎসবের রূপ ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে ‘বেঙ্গলি নিউ ইয়ার’ এখন অনেকটাই পাশ্চাত্য ঘরানার ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর ছাঁচে ঢুকে পড়েছে। নববর্ষের এই রূপান্তর ও হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো নিয়ে সম্প্রতি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা।

ফুরিয়ে আসছে হালখাতার জৌলুস

ছোটবেলার নববর্ষের কথা মনে পড়লে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়েন হৈমন্তী শুক্লা। শিল্পী জানান, একসময় নববর্ষ মানেই ছিল এক অধীর অপেক্ষা। বাড়ির আশেপাশের দোকানগুলোতে হালখাতার আয়োজন থাকত। দোকান থেকে আসা মিষ্টির বাক্স আর নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার পাওয়ার আনন্দ ছিল অন্যরকম। অতিথি আপ্যায়নে লাল, নীল, হলুদ রঙের শরবতের দাপাদাপি আর হইচইয়ে মুখরিত থাকত পাড়া। এখন সেই রীতি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। যান্ত্রিকতার ভিড়ে ঐতিহ্যিক সেই আমেজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না বলেই মনে করেন শিল্পী।

বসুশ্রী সিনেমা হলের সেই স্বর্ণালি দিন

সত্তর ও আশির দশকে নববর্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল গানের আসর। বিশেষ করে কলকাতার বসুশ্রী সিনেমা হলে আয়োজিত নববর্ষের অনুষ্ঠানগুলো ছিল সংস্কৃতির পীঠস্থান। হৈমন্তী শুক্লা জানান, নববর্ষের দিন কোনো শিল্পীই অন্য কোথাও প্রোগ্রাম রাখতেন না, কারণ ওইদিন বসুশ্রীতে গাইতেই হতো। উত্তম কুমার থেকে শুরু করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো নক্ষত্রদের উপস্থিতি সেই আসরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেত। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো কিংবদন্তিদের জুগলবন্দি এখন কেবলই সোনালি স্মৃতি।

বদলেছে উৎসবের সংজ্ঞা

শিল্পীর কথায়, সময়ের সাথে সাথে উৎসব উদযাপনের ধরন বদলানো স্বাভাবিক হলেও, মানবিক সংযোগগুলো কমে যাওয়ায় আক্ষেপ থেকেই যায়। নববর্ষের সেই প্রাণবন্ত আড্ডা, ঘরোয়া খাওয়া-দাওয়া আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন এখন সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। হৈমন্তী শুক্লার এই আক্ষেপ মূলত বাঙালির শিকড় থেকে দূরে সরে আসারই একটি প্রতিচ্ছবি। পুরনো দিনের সেই উন্মাদনা আর আভিজাত্য বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনেকটা রূপকথার মতো মনে হতে পারে। তবুও নববর্ষের মূল সুর অটুট রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী।

এক ঝলকে

  • নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী হালখাতার চল ও মিষ্টিমুখের রীতি এখন প্রায় বিলুপ্ত।
  • পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে পয়লা বৈশাখের চেয়ে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর আমেজ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
  • সত্তর ও আশির দশকে বসুশ্রী সিনেমা হলে আয়োজিত গানের আসর ছিল নববর্ষের প্রধান আকর্ষণ।
  • উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়—সবাই নববর্ষে বসুশ্রীর মঞ্চে একাত্ম হতেন।
  • যান্ত্রিক ব্যস্ততা ও ডিজিটাল দুনিয়ার আধিপত্যে বাঙালির নববর্ষের সেই ঘরোয়া আড্ডা আজ অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *