পদত্যাগ করব না! গণনায় চরম কারচুপির অভিযোগে সরব মমতা এবং রাজ্যপালের কোর্টে বল ঠেলে নয়া জল্পনা

রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন টানাপোড়েন এবং চরম সাংবিধানিক সঙ্কটের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কিছুতেই মেনে নিতে রাজি নন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার দলের জয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে এক দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর নিজের অবস্থানে তিনি সম্পূর্ণ অনড়। ভোটের গণনায় ব্যাপক এবং পরিকল্পিত কারচুপি হয়েছে বলে তিনি মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন। এই পরিস্থিতিতে তিনি নিজের পদ থেকে কোনোভাবেই ইস্তফা দেবেন না বলে দলীয় বৈঠকে ঘোষণা করেছেন। তাঁর এই অনমনীয় মনোভাব রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন এবং জটিল অধ্যায়ের সূচনা করল।
গণনায় কারচুপির মারাত্মক অভিযোগ ও ইস্তফায় অনীহা
বুধবারের এই বিশেষ বৈঠকে তৃণমূলের টিকিটে সদ্য জয়ী হওয়া বিধায়করা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে তাঁরা ভোটগ্রহণ পর্ব এবং বিশেষ করে গণনাকেন্দ্রের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দলনেত্রীর সামনে তুলে ধরেন। একাধিক জয়ী প্রার্থীর বক্তব্য ও বুথস্তরের রিপোর্ট শোনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই ফলাফল কোনোভাবেই জনমতের সঠিক প্রতিফলন নয়। গোটা গণনা প্রক্রিয়াটিকেই ত্রুটিপূর্ণ, অস্বচ্ছ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। সেই যুক্তিতেই প্রথাগতভাবে হারের দায় মাথা পেতে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার যে রাজনৈতিক রীতি, তা তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের মনোবল অটুট রাখতে এবং বিরোধী শিবিরের জয়ের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই তিনি এই আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করেছেন।
রাজ্যপালের কোর্টে বল এবং সম্ভাব্য সাংবিধানিক সঙ্কট
পদত্যাগ না করার এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাঁর বর্তমান সরকার নিয়ে রাজ্যপাল বা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ যা পদক্ষেপ করার তা করতে পারেন। অর্থাৎ, সরকার ভাঙা বা নতুন সরকার গড়ার আইনি দায়ভার তিনি সরাসরি রাজভবনের কোর্টে ঠেলে দিয়েছেন। এর সম্ভাব্য প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরেও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যদি নিজে থেকে ইস্তফা না দেন, তবে রাজ্যপালকে নিজস্ব ক্ষমতাবলে তাঁকে বরখাস্ত করে নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গড়ার আহ্বান জানাতে হতে পারে। এর ফলে রাজ্য প্রশাসন এক অভূতপূর্ব আইনি এবং সাংবিধানিক জটিলতার মুখে পড়তে চলেছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরেও বাংলার রাজনৈতিক উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণই নেই। একদিকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং অন্যদিকে তৃণমূল নেত্রীর এই অনড় অবস্থান—সব মিলিয়ে রাজভবনের সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ। এই সংঘাত কেবল রাজনৈতিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা শীর্ষ আদালতের চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
প্রতিবেদক বর্তমান ঠাকুর।
