মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর রাজ্যাভিষেক, এবার কি বদলাবে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি?

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর রাজ্যাভিষেক, এবার কি বদলাবে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। বিধানসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও, জন আকাঙ্ক্ষার চাপ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করা এখন নতুন সরকারের সামনে প্রধান পরীক্ষা। দীর্ঘ সময় ধরে একদলীয় শাসনের ঐতিহ্য থাকা এই রাজ্যে বিজেপির এই জয় যেমন বড় সাফল্য, তেমনি আগামীর পথ চলায় রয়েছে একাধিক জটিল কাঁটা।

বাঙালি সংস্কৃতি ও আদর্শিক মেলবন্ধন

শুভেন্দু সরকারের সামনে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ‘হিন্দি বলয়ের দল’ হিসেবে পরিচিত বিজেপির ভাবমূর্তিকে খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। শপথ গ্রহণের দিনটি ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী। প্রতীকীভাবে রবীন্দ্রসংগীত বাজলেও, মাঠপর্যায়ে ধর্মীয় স্লোগানের প্রাবল্য সাংস্কৃতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রতীকী শ্রদ্ধা নয়, বরং বাঙালির আবেগ ও দর্শনের মূল সুরকে ধারণ করাই হবে বিজেপির জন্য বড় কাজ। ‘বহিরাগত’ তকমা ঘুচিয়ে বাংলার নিজস্ব কৃষ্টির সঙ্গে আদর্শিক মেলবন্ধন ঘটানোই হবে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম বড় পরীক্ষা।

উন্নয়ন ও জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের ভবিষ্যৎ

বিদায়ী তৃণমূল সরকারের সাফল্যের মূলে ছিল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। যদিও বিজেপি নারী নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতির ইস্যুকে সামনে রেখে জয়ী হয়েছে, তবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা স্বাস্থ্যসাথীর মতো জনপ্রিয় প্রকল্পগুলোর বিকল্প বা ধারাবাহিকতা রক্ষা করা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে। কেন্দ্রীয়ভাবে বিজেপি ‘রেউড়ি কালচার’ বা জনমোহিনী খয়রাতির বিরোধী হলেও, বাংলার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখতে এই সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

দুর্নীতি দমন ও কর্মসংস্থানের চাপ

স্কুল সার্ভিস কমিশনসহ বিভিন্ন নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার ছিল। ফলে এখন একটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দেওয়া শুভেন্দু অধিকারীর নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের শিক্ষিত তরুণদের ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে চলে যাওয়া আটকাতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খোলা জরুরি। এছাড়া, অনুপ্রবেশ ইস্যু এবং রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করাও সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। ধর্মীয় মেরুকরণ কাটিয়ে ‘সবার সাথে, সবার বিকাশ’ মন্ত্রটি বাস্তবে প্রয়োগ করাই এখন সময়ের দাবি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *