যখন দেউলিয়া হওয়ার মুখে ছিল দেশ: ৬৭,০০০ কেজি সোনা বন্ধক রেখে যেভাবে বেঁচেছিল ভারতের অর্থনীতি! – এবেলা

যখন দেউলিয়া হওয়ার মুখে ছিল দেশ: ৬৭,০০০ কেজি সোনা বন্ধক রেখে যেভাবে বেঁচেছিল ভারতের অর্থনীতি! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

১৯৯১ সালের সেই কালো দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও শিউরে ওঠেন অর্থনীতিবিদরা। দেশ তখন খাদের কিনারে, কোষাগার প্রায় শূন্য। বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার এতটাই কমে গিয়েছিল যে, মাত্র এক সপ্তাহের আমদানি ব্যয় মেটানোর ক্ষমতা ছিল ভারতের। ঋণের দায়ে জর্জরিত দেশটি যখন বিশ্বমঞ্চে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখন রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল ভারতেরই সঞ্চিত সোনা। নিজের সম্মান ও আভিজাত্যের প্রতীক সেই সোনা বিদেশে বন্ধক রেখেই নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচেছিল ভারতীয় অর্থনীতি।

সংকটের নেপথ্যে ছিল যুদ্ধ আর অভ্যন্তরীণ নীতি

সেই সময়ে ভারতের অর্থনীতির বেহাল দশার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ‘লাইসেন্স পারমিট রাজ’ এবং সরকারি হস্তক্ষেপ। বদ্ধ অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিল। সেই আগুনে ঘি ঢেলেছিল উপসাগরীয় যুদ্ধ। মাত্র ১৭ ডলারের অপরিশোধিত তেলের দাম একলাফে ৩৬ ডলারে পৌঁছে যাওয়ায় আমদানির খরচ ভারতের নাগালের বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে, প্রধান রপ্তানি সহযোগী সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ভারতের আয়ের পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে রাজকোষ ঘাটতি জিডিপির ৮.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।

লজ্জা লুকিয়ে বিমানে চেপেছিল ৪৭ টন সোনা

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর, অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা এবং বিশেষ উপদেষ্টা মনমোহন সিং এক কঠিন কিন্তু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে আরবিআই ইংল্যান্ড এবং জাপানের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সোনা বন্ধকের চুক্তি করে। মুম্বাই বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তায় বিশেষ বিমানে করে ৪৭ টন সোনা ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড এবং ব্যাংক অফ জাপানে পাঠানো হয়। এছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক অফ সুইজারল্যান্ডে রাখা আরও ২০ টন সোনা বন্ধক রাখা হয়। সর্বমোট প্রায় ৬৭ হাজার কেজি সোনা বন্ধক রেখে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে ভারত তার আন্তর্জাতিক দেনা শোধ করে এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সোনার গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ

আজ ভারত যখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি, তখনও সোনা তার গতিরোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে এক বছর সোনা না কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারত তার চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ সোনা বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়। তেলের উচ্চমূল্য এবং সোনার আমদানির এই জোড়া চাপ সামাল দিতেই সরকার সাশ্রয়ী হওয়ার ডাক দিয়েছে, যাতে ১৯৯১ সালের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সোনা সব সময়ই সংকটের সাথী, তবে সেই সোনা আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা যে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির, ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *