ভারতের ‘বাসুকি’ও নস্যি! ৭.৩ কিমি লম্বা এই ট্রেনের সামনে ১০টি হাওড়া ব্রিজও ছোট – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
রেলপথে দীর্ঘতম মালগাড়ি হিসেবে ভারতের ‘বাসুকি’ আমাদের গর্বের কারণ হলেও বিশ্ব মানচিত্রে এর অবস্থান চতুর্থ। ৩.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই ট্রেনটি ছত্তিশগড় থেকে কয়লা পরিবহনে বিশেষ ভূমিকা রাখলেও বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রেনের রেকর্ডের কাছে এটি নেহাতই ম্লান। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ট্রেনের মুকুটটি রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ‘বিএইচপি আয়রন ওর’ (BHP Iron Ore) ট্রেনের মাথায়, যার দৈর্ঘ্য ও ওজনের পরিসংখ্যান শুনলে যে কেউ চমকে উঠতে বাধ্য।
দৈত্যাকার বিএইচপি আয়রন ওর ট্রেনের রেকর্ড
২০০১ সালের ২১ জুন অস্ট্রেলিয়ার নিউম্যান থেকে পোর্ট হেডল্যান্ড পর্যন্ত ২৭৫ কিলোমিটার পথে প্রথমবার যাত্রা করেছিল বিএইচপি আয়রন ওর ট্রেনটি। মোট ৭.৩৫ কিলোমিটার লম্বা এই ট্রেনটিতে ছিল ৬৮২টি ওয়াগন, যা বহন করেছিল ৮২ হাজার ২৬২ টন লোহার আকরিক। এই সুবিশাল ভার টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল ৮টি শক্তিশালী ডিজেল লোকোমোটিভ ইঞ্জিন। অবাক করা বিষয় হলো, রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে সমন্বয় করে এই সম্পূর্ণ ট্রেনটি চালিয়েছিলেন মাত্র একজন চালক। ১০টি হাওড়া ব্রিজকে একত্রে জোড়া দিলে যতটা দৈর্ঘ্য হয়, এই ট্রেনটি একাই ছিল ততটা দীর্ঘ।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘতম ট্রেনগুলোর তালিকা
অস্ট্রেলিয়ার এই রেকর্ডধারী ট্রেনটি ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও অতি দীর্ঘ ট্রেনের নিয়মিত চলাচল রয়েছে।
- মৌরিতানিয়া আয়রন ওর: আফ্রিকার মৌরিতানিয়াতে সাহারা মরুভূমির বুক চিরে ৩ কিলোমিটার লম্বা এই ট্রেনটি আজও নিয়মিত চলে। এর বিশেষত্ব হলো, কোনো যাত্রীবাহী কোচ না থাকলেও স্থানীয় মানুষ লোহার আকরিকের ওপর বসেই যাতায়াত করেন।
- সুইজারল্যান্ডের রেকর্ড: ২০২২ সালে ১.৯১ কিলোমিটার লম্বা যাত্রীবাহী ট্রেন চালিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে সুইজারল্যান্ড। ১০০টি কোচের এই ট্রেনটি আল্পস পাহাড়ের দুর্গম পথে পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
- আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকা: আমেরিকা ৫.৬ কিলোমিটার লম্বা ট্রেনের সফল পরীক্ষা করলেও নিয়মিত যাতায়াতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মালগাড়ি নিয়মিত আকরিক বহন করে।
বিশাল ট্রেনের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
এত বিশাল ট্রেন চালানোর মূল কারণ হলো অর্থনৈতিক সাশ্রয়। একটি মাত্র ক্রু এবং একটি ইঞ্জিন সেটআপ দিয়ে ৩-৪টি ট্রেনের সমপরিমাণ পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হয়, যা ডিজেল ও কর্মীদের পেছনে খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এছাড়া এতে রেললাইনে ট্র্যাফিক জ্যাম কমে এবং কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
তবে এই সুবিধার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ১ লাখ টন ওজনের একটি ট্রেনকে থামাতে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরত্ব প্রয়োজন হয়। এছাড়া সাধারণ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মগুলো বড়জোর ১ কিলোমিটার লম্বা হওয়ায় এই ট্রেনগুলোকে স্টেশনে জায়গা দেওয়া বা ক্রসিং করানো অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। ভারতের ‘বাসুকি’ ট্রেনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়; এর দৈর্ঘ্য ৩.৫ কিলোমিটার হওয়ায় এটি সাধারণ লুপ লাইনে ধরে না, ফলে ইয়ার্ডে ঢোকানোর সময় ট্রেনটিকে তিন ভাগে ভেঙে নিতে হয়।
পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভারত যে দ্রুত রেলের আধুনিকায়নে এগোচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ ও শক্তিশালী ট্রেন দেখার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আপাতত বাসুকিই দেশের রেল ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
