একাকী নারীর লড়াই থেকে রূপালী পর্দার রাজত্ব, ভারতীয় সিনেমার পথপ্রদর্শক লীলা চিতনিসের বিস্ময়কর জীবন – এবেলা

একাকী নারীর লড়াই থেকে রূপালী পর্দার রাজত্ব, ভারতীয় সিনেমার পথপ্রদর্শক লীলা চিতনিসের বিস্ময়কর জীবন – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য এবং উজ্জ্বল নক্ষত্র লীলা চিতনিস। ১৯৩০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে রূপালী পর্দায় তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক আলোকবর্তিকা হয়ে রয়েছে। ১৯০৯ সালে জন্ম নেওয়া লীলা চিতনিস ছিলেন সেই যুগের অন্যতম এক উচ্চশিক্ষিত নারী। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশায় চিকিৎসক গজানন যশবন্ত চিতনিসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় এবং পরবর্তীকালে তাঁদের চার সন্তান হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বিপ্লবী এম.এন. রায়কে আশ্রয় দিয়ে দেশপ্রেমের নজির গড়েছিলেন এই দম্পতি। তবে জীবনের সব আলো তাঁর পক্ষে ছিল না, ব্যক্তিগত জীবনে চরম অশান্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে।

দাম্পত্যের ভাঙন ও অভিনয়ে রূপান্তর

স্বামীর মদ্যপানের কারণে বৈবাহিক জীবন বিষাদময় হয়ে উঠলে চার সন্তানকে সাথে নিয়ে একাই বাঁচার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন লীলা চিতনিস। সন্তানদের মানুষ করার তাগিদে প্রথমে শিক্ষকতা শুরু করলেও, পূর্বের নাট্যচর্চার অভিজ্ঞতা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে অভিনয় দুনিয়ায়। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে একক মায়ের এই লড়াই ছিল এক চরম সামাজিক পরীক্ষা। শুরুতে কিছু ছোট চরিত্রে অভিনয়ের পর ১৯৩৭ সালে ‘জেন্টলম্যান ডাকু’ ছবিতে পুরুষের ছদ্মবেশে অ্যাকশন চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রথম নজর কাড়েন। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ১৯৩৯ সালের ‘কঙ্গন’ ছবিটি। এই ছবির বিপুল ব্যবসায়িক সাফল্য তাঁকে বোম্বে টকিজ স্টুডিওর প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

ইতিহাসের প্রথম লাক্স গার্ল ও মায়ের চরিত্রে নতুন অধ্যায়

জনপ্রিয় অভিনেতা অশোক কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘বন্ধন’, ‘আজাদ’ ও ‘ঝুলা’-র মতো একের পর এক ব্লকবাস্টার ছবি উপহার দেন লীলা চিতনিস। তাঁর এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার ফলেই ১৯৪১ সালে প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ‘লাক্স’ সাবানের অ্যাম্বাসাডর হয়ে ইতিহাস গড়েন তিনি। এরপর ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি নতুন নায়িকাদের আগমনে নায়িকা হিসেবে তাঁর চাহিদা কমতে শুরু করলেও, তিনি দমে যাননি। বরং চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ইনিংস শুরু করেন।

দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর, দেব আনন্দ, শাম্মি কাপুর এবং ধর্মেন্দ্রর মতো ভারতীয় সিনেমার দিকপাল তারকাদের অনস্ক্রিন মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শক হৃদয়ে অমর হয়ে যান। ‘আওয়ারা’, ‘মা’, ‘নয়া দৌর’, ‘ওয়াক্ত’ এবং ‘গাইড’-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলো তাঁর জোরালো অভিনয়ের কারণে আজও স্মরণীয়। ১৯৫৫ সালে ‘আজ কি বাত’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালনায় পা রাখলেও তা বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি। অবশেষে ১৯৮৫ সালে ‘দিল তুঝকো দিয়া’ ছবির মাধ্যমে দীর্ঘ অভিনয় জীবনের ইতি টেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী হন এবং ২০০৩ সালে ৯৩ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সংগ্রাম ও সাফল্য আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এক গৌরবময় অধ্যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *