জ্বালানির পর বিদ্যুৎ সংকট? ব্যবহারে রাশ টানার বার্তা কেন্দ্রের, আতঙ্কে আম জনতা – এবেলা

জ্বালানির পর বিদ্যুৎ সংকট? ব্যবহারে রাশ টানার বার্তা কেন্দ্রের, আতঙ্কে আম জনতা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

সোনা কেনা বন্ধ করা এবং পেট্রল-ডিজেলের খরচ কমানোর বার্তার পর এবার দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কেন্দ্রের নতুন বার্তা— বুঝেশুনে বিদ্যুৎ ব্যবহার করুন। পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্য) যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর সংকটের জেরে ভারতের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজার ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত। রেকর্ড পতন হয়েছে টাকার মূল্যে, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধিতে জেরবার আমজনতা। এই কঠিন পরিস্থিতির মাঝেই এবার দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের (Power Crisis) কালো মেঘ দেখা দেওয়ায় আম আদমির মনে এক অজানা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

উত্তর ও মধ্য ভারতে তাপমাত্রা ৪৬ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, রাজধানী দিল্লিতে পারদ ছুঁয়েছে ৪৭ ডিগ্রি। অন্য দিকে, কলকাতা-সহ পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ‘ফিলস লাইক’ বা অনুভূত তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই তীব্র দাবদাহের মধ্যে বিদ্যুৎ মন্ত্রকের এই সতর্কবার্তা বিষফোঁড়ার মতো দেখা দিয়েছে।

বিদ্যুতের চাহিদা ভাঙল সব রেকর্ড

তীব্র গরমের কারণে একদিকে কল-কারখানা এবং অন্যদিকে গৃহস্থ বাড়িতে এসি ও ফ্যানের ব্যবহার এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রকের মতে, দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত সময়টিকে ‘পিক আওয়ার’ (Peak Hour) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সময়ে অফিস-আদালত ও কারখানার পাশাপাশি গরম থেকে বাঁচতে ঘরে ঘরে একাধিক এসি ও ফ্যান চালানো হচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যানে বিদ্যুতের ঘাটতি:

  • চাহিদার উল্লম্ফন: গত ১৮ মে দেশজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৫৮ গিগাওয়াট, যা মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে (২১ মে) বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২৭১ গিগাওয়াটে।
  • এসি-র ব্যবহার বৃদ্ধি: গত এক বছরে ভারতে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ নতুন এসি বিক্রি হয়েছে, যা প্রতি বছর বিদ্যুতের গ্রিডের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করছে।

কয়লার সংকট ও রেশনে বণ্টন

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রান্নার গ্যাসের (LPG) সংকটের কারণে দেশজুড়ে বিকল্প হিসেবে কয়লার ব্যবহার মারাত্মক হারে বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিহার সরকার গরিব মানুষের সুবিধার্থে রেশনে কয়লা বণ্টনের ঘোষণা করেছে।

এই বিপুল চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে যেমন কয়লার দাম বাড়ছে, তেমনই দেশের অভ্যন্তরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে কয়লার জোগান বা সাপ্লাই কমছে।

  • কয়লার স্টক হ্রাস: দেশের প্রথম সারির ১৮৯টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার স্টক বিপজ্জনকভাবে কমছে। গত বছর মে মাসে যেখানে ৫ কোটি ৭০ লক্ষ টন কয়লা মজুত ছিল, সেখানে এ বছর ২০ মে পর্যন্ত মজুত রয়েছে মাত্র ৫ কোটি ১০ লক্ষ টন। অর্থাৎ স্টক ৮০ শতাংশ থেকে কমে ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
  • কর্তৃপক্ষের দাবি: সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (CEA)-র মতে, দৈনিক ২৭০ গিগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দিতে হলে দেশে অন্তত ৭ কোটি ৫০ লক্ষ টন কয়লা মজুত থাকা জরুরি, যা বর্তমান স্টকের চেয়ে অনেক বেশি।

সরকারের আশ্বাস বনাম বিরোধীদের তোপ

কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, দেশের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সরকার সম্পূর্ণ সক্ষম। তবে তা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে দেশবাসীকে বিশেষত পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযত ও সতর্ক হওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

এদিকে, ডিজেলের অভাবে পণ্য পরিবহণ থমকে যাওয়া, টাকার পতন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যয়সংকোচের বার্তার পর এবার বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রের এই আবেদনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পারদ চড়ছে। “ভারতের অর্থনীতি ঠিক কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, সরকার তা স্পষ্ট করে দেশবাসীকে জানাক”— এই দাবি তুলে সরব হয়েছে দেশের বিরোধী দলগুলো।

এক ঝলকে

  • মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও তীব্র দাবদাহের আবহে দেশবাসীকে বুঝেশুনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরামর্শ দিল কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক।
  • মাত্র ৩ দিনে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ২৫৮ গিগাওয়াট থেকে লাফিয়ে ২৭১ গিগাওয়াটে পৌঁছে রেকর্ড তৈরি করেছে।
  • তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে কয়লার স্টক ৮০% থেকে কমে ৬৮% হয়েছে; রান্নার গ্যাসের অভাবে বিহারে রেশনে কয়লা দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
  • দুপুর ২টো থেকে ৪টে (পিক আওয়ার)-র মধ্যে অপ্রয়োজনীয় এসি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখার আবেদন কেন্দ্রের।
  • জ্বালানি ও টাকার পতনের পর বিদ্যুৎ নিয়ে কেন্দ্রের এই বার্তায় দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *