ক্ষমতা বদলাতেই চরম অ্যাকশন! বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো বেআইনি টোল অফিস – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হতেই জেলায় জেলায় শুরু হয়ে গেছে বেআইনি পরিকাঠামো ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ। শুক্রবার সকালে তারই এক চরম নাটকীয় রূপ দেখল হুগলির কোন্নগর। কোন্নগর রেল স্টেশন সংলগ্ন আন্ডারপাসের সামনে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি টোল আদায়ের অফিসকে বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। এই গোটা উচ্ছেদ অভিযানের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নেতৃত্ব দিলেন উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী।
দীর্ঘদিন ধরে কোন্নগর রেল স্টেশনের এই ব্যস্ত আন্ডারপাসে টোল গেট বসিয়ে যাতায়াতকারী যানবাহন থেকে টাকা তোলা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং চালকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। নতুন বিধায়ক আসতেই সেই ক্ষোভের অবসান ঘটল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। সম্প্রতি রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হওয়ার পরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, রাজ্য জুড়ে কোনো রকম অনুমোদনহীন বা বেআইনি টোল ট্যাক্স আদায় বরদাস্ত করা হবে না। নবান্ন থেকে এই সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকা জারি হওয়ার পর সেই নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করেই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
বৈধ নথিপত্রের অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ
ঘটনার সূত্রপাত হয় উত্তরপাড়া কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তী বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর। দায়িত্ব নিয়েই তিনি কোন্নগর পুরসভায় যান এবং এই আন্ডারপাসে টোল আদায়ের অনুমতি সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র ও কাগজপত্র দেখতে চান। কিন্তু পুরসভা কর্তৃপক্ষ এই টোল আদায়ের সপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। তদন্তে জানা যায়, আন্ডারপাসে টোল আদায়ের জন্য ২০০৮ সালে প্রথমবার লিজ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর তা কোনোদিন নবীকরণ করা হয়নি। অথচ বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই টোল ট্যাক্স তোলার কাজ রমরমিয়ে চলছিল। বিধায়ক প্রথমে পুলিশকে কোন্নগর আন্ডারপাসের টোল আদায় বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং পরবর্তীতে সশরীরে উপস্থিত থেকে বুলডোজার দিয়ে সেই অফিস ভেঙে দেন।
উচ্ছেদ অভিযান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে উত্তরপাড়ার বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, এলাকায় কোনো রকম বেআইনি কাজ আর বরদাস্ত করা হবে না। আজ টোল অফিস ভাঙা হয়েছে, আগামীদিনে বেআইনি পার্টি অফিস হোক কিংবা বেআইনি বাড়ি, আইন লঙ্ঘন করে কিছু করা হলে সবার বিরুদ্ধেই সমভাবে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রক্ষণাবেক্ষণের যুক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পাল্টা দাবি
অন্যদিকে, এই উচ্ছেদ ও টোল বন্ধের ঘটনা নিয়ে কোন্নগর পুরসভার বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বপন দাস সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই কাজ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান স্বপন দাসের দাবি, ২০০০ সালে রেল এবং রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে কোন্নগর স্টেশনের এই আন্ডারপাসটি তৈরি হয়েছিল। এই জায়গাটি মূলত জেলা পরিষদের অধীনে ছিল এবং পরবর্তীতে এর দেখভালের দায়িত্ব কোন্নগর পুরসভাকে দেওয়া হয়।
২০০৮ সাল থেকে এই টোল আদায় চলছে এবং ২০২২ সাল পর্যন্ত এর থেকে বছরে ১২ হাজার টাকা করে পেত পুরসভা। বিগত তিন বছর ধরে তিনি সেটি বাড়িয়ে বার্ষিক ৫০ হাজার টাকা করেছিলেন। চেয়ারম্যানের যুক্তি, আন্ডারপাসের তলায় জল জমে যাওয়া, নোংরা আবর্জনা পরিষ্কার করা—এই সমস্ত রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য পুরসভাকে নিয়মিত সাফাইকর্মী ও লোক লাগাতে হয়। সেই খরচের একটা বড় অংশ এই টোল আদায়ের টাকা থেকে আসত। সরকারের নতুন নির্দেশিকা আসার পর তারা জেলা পরিষদের কাছে লিখিত নির্দেশের জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু তা পাওয়ার আগেই তড়িঘড়ি এই বুলডোজার চালানো হলো।
এই উচ্ছেদ অভিযানের ফলে স্থানীয় স্তরে বেআইনি অর্থ আদায়ের উৎসে যেমন আঘাত হানা গেছে, তেমনই পুরসভার রক্ষণাবেক্ষণ তহবিলের আয়ের পথ বন্ধ হওয়া নিয়ে এক ধরনের প্রশাসনিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের নতুন নীতি ও কড়া মনোভাবের কারণে আগামী দিনে রাজ্যের অন্যান্য বেআইনি পরিকাঠামোর ওপরও এর বড়সড় প্রভাব পড়তে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
