পাকিস্তানের পরমাণু স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দেওয়ার গোপন ছক, কেন শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে এলেন ইন্দিরা গান্ধী – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
আটের দশকের গোড়ার দিকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায় তৈরি হয়েছিল। গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির একেবারে শেষলগ্নে পৌঁছে গিয়েছিল পাকিস্তান। তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রপ্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টোর “ঘাস খেয়ে থাকব, তাও পরমাণু বোমা বানাব” উক্তিটি বাস্তব রূপ পেতে চলেছিল ‘প্রজেক্ট-৭-৬’ (Project-706)-এর হাত ধরে। বিজ্ঞানী এ কিউ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির কাছে কহুটা ইউরেনিয়াম সংবর্ধন কেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হচ্ছিল এই ‘ইসলামিক বোম’। এই খবর পেয়েই দিল্লির সাউথ ব্লক আর তেল আভিভের মোসাদ সদর দফতরে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়। পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তি হওয়া থেকে রুখতে পর্দার আড়ালে তৈরি হয়েছিল এক অত্যন্ত গোপন সামরিক পরিকল্পনা, যার নাম ‘অপারেশন কহুটা’।
ভারত ও ইজরায়েলের যৌথ যুদ্ধপ্রস্তুতি
সেই সময় ভারতের সাথে ইজরায়েলের কোনও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। ভারত প্রকাশ্যে প্যালেস্টাইনকে সমর্থন করলেও তলে তলে দিল্লির সাথে তেল আভিভের নিবিড় নিরাপত্তা বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। ১৯৮১ সালে ইজরায়েল যেভাবে ইরাকের ওসিরাক পরমাণু রিয়্যাক্টর গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, ঠিক সেই মডেলেই কহুটা ওড়ানোর ছক কষা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইজরায়েলের ৬টি F-16 এবং ৬টি F-15 যুদ্ধবিমান হাইফা থেকে উড়ে এসে প্রথমে গুজরাটের জামনগরে নামার কথা ছিল। সেখান থেকে জ্বালানি নিয়ে তারা চলে যেত জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুর এয়ারবেসে। মাটির নিচের বাঙ্কার ধ্বংস করতে বিশেষ ‘পেনিট্রেশন বোম’ আগেই সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল এবং ভারতীয় বায়ুসেনার জাগুয়ার স্কোয়াড্রনও নীচু দিয়ে উড়ে বোমাবর্ষণের মহড়া শুরু করে দিয়েছিল।
গোয়েন্দা তৎপরতা ও কূটনৈতিক ছন্দপতন
পাকিস্তানের এই পরমাণু ষড়যন্ত্রের ওপর কড়া নজর রাখছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। কহুটার পরমাণু কেন্দ্রের আশেপাশের সেলুন থেকে সংগৃহীত চুলের রেডিয়েশন টেস্ট করেই ভারত নিশ্চিত হয়েছিল যে, পাকিস্তান অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানাচ্ছে। তবে এর মাঝেই এক বড় ছন্দপতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই অসতর্কতাবশত পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক জিয়া-উল-হককে ইঙ্গিত দিয়ে দেন যে ভারত তাদের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে সব জানে। এর জেরে পাকিস্তানে থাকা বহু ভারতীয় এজেন্টকে নির্মমভাবে খতম করে ইসলামাবাদ।
অপারেশন স্থগিতের কারণ ও প্রভাব
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শুরুতে এই যৌথ হামলায় সবুজ সংকেত দিলেও, শেষ মুহূর্তে অপারেশন স্থগিত করে দেন। এর নেপথ্যে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছিল। প্রথমত, মার্কিন চাপ; তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান আফগানিস্তানে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়তে পাকিস্তানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিলেন, ফলে এই হামলায় আমেরিকা তীব্র চটে যেত। দ্বিতীয়ত, মহাসংগ্রামের আশঙ্কা; পাকিস্তান স্পষ্ট হুমকি দিয়েছিল যে কহুটাতে আঘাত হলে তারা পাল্টা মুম্বইয়ের ট্রম্বে পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হানবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিশ্বজনীন তীব্র প্রতিক্রিয়ার ভয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ইতিহাসের চাকা আর ঘোরেনি। কহুটা ধ্বংস না হওয়ায় ১৯৯৮ সালের ২৮ মে পরমাণু পরীক্ষা করে বিশ্বের প্রথম ‘ইসলামিক পরমাণু শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পাকিস্তান। বর্তমানে পাকিস্তানের ঝুলিতে রয়েছে প্রায় ১৭০টি সক্রিয় পরমাণু ওয়ারহেড এবং তারা ভারতের মতো ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতিতে বিশ্বাসী নয়। আটের দশকে নেওয়া ভারতের সেই সিদ্ধান্তই আজকের দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু রাজনীতির গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছে।
