পত্রিকার পাতায় রক্তছাপ, ট্যাবু ভাঙার অভিনব লড়াই জোহানেসবার্গে – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
সংবাদপত্রের পাতার একটি সাধারণ প্রতিবেদনের মাঝে হঠাৎ গাঢ় লাল রঙের পোঁচ। প্রথম দেখায় যে কেউ ভাবতেই পারেন, এটি হয়তো ছাপাখানার কোনো বড় ভুল বা সম্পাদকীয় অসাবধানতা। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘দ্য স্টার’-এর পাতায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি কোনো ভুল ছিল না। এটি ছিল ঋতুকালীন ট্যাবু ও জড়তার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে সযত্নে সাজানো একটি অভিনব বিজ্ঞাপনী প্রচারকৌশল।
আফ্রিকা জুড়ে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণকারী সংস্থা ‘মেনস্ট্রুয়েশন ফাউন্ডেশন’ এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি নিয়েছে। বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন ছিল, ‘হোয়াট ইফ ইওর প্যাড কুড লাস্ট ফাইভ ইয়ার্স?’ অর্থাৎ, এমন কোনো স্যানিটারি ন্যাপকিন কি আছে যা পাঁচ বছর স্থায়ী হতে পারে? অবাস্তব এই লাইনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল বাস্তবটি হলো ঋতুস্রাবের রক্তছাপ, যা নিয়ে সমাজ এখনো তীব্র জড়তা ও লুকোচুরির মানসিকতা লালন করে।
ট্যাবু বনাম পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা
ঋতুস্রাবের মতো একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও জৈবিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে সমাজজুড়ে এখনো নানা কুসংস্কার ও লজ্জার আবহ তৈরি করে রাখা হয়েছে। এমনকি বিনোদন মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন কনটেন্টেও দেখা যায়, গণপরিবহনে বা জনসমক্ষে কোনো নারীর পোশাকে অসাবধানতাবশত ঋতুস্রাবের দাগ লাগলে তা নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে কোনো পুরুষ ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে এসে সেই অপমানের প্রতিশোধ নেয়। এই ধরনের চিত্রায়ণ প্রকারান্তরে নারীর অসহায়ত্ব এবং পুরুষের পেশিশক্তির আস্ফালনকে আরও বেশি বৈধতা দেয়। জোহানেসবার্গের এই বিজ্ঞাপনটি ঠিক এই জায়গাতেই বড় একটি ধাক্কা দিয়েছে। এখানে কোনো পুরুষতান্ত্রিক হিরোপন্তি নেই, বরং সরাসরি বাস্তবতাকে সামনে এনে সচেতনতার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার প্রভাব ও সচেতনতার বার্তা
কোনো নারীই জ্ঞানত ঋতুস্রাবের রক্তছাপ নিয়ে অসাবধান হন না, তাও প্রকৃতির নিয়মে অবাঞ্ছিত ক্ষরণ হতেই পারে। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই রক্তছাপকে পত্রিকার পাতায় তুলে ধরে বোঝানো হয়েছে যে, বিষয়টি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং একে সামাজিক লজ্জার কারণ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ঋতুমতী নারীই সৃষ্টির দ্যোতক, তাই এই প্রক্রিয়াকে সহজভাবে গ্রহণ করাই সুস্থ সমাজের লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রচার কৌশল সমাজে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ঋতুস্রাব সংক্রান্ত ট্যাবু বা জড়তা ভাঙতে বড় ভূমিকা রাখবে। এটি প্রমাণ করে যে, রক্ষণশীল মনোভাব দূর করতে এবং নারীদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে কোনো পেশিশক্তির প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন।
