১৭ বছরের বন্দিদশা শেষ: পুলিশি তদন্তে চরম গাফিলতি, ২০০৯-এর হত্যা মামলায় বেকসুর খালাস দুই ভাই! – এবেলা

১৭ বছরের বন্দিদশা শেষ: পুলিশি তদন্তে চরম গাফিলতি, ২০০৯-এর হত্যা মামলায় বেকসুর খালাস দুই ভাই! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

দীর্ঘ ১৭টি বছর কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে কাটানোর পর অবশেষে ন্যায়বিচার পেলেন দুই ভাই — তুলসীরাম ও হরপ্রসাদ রাজপাল। ২০০৯ সালের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই ভাইকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট। তদন্তে পুলিশের মারাত্মক গাফিলতি, নথিপত্রে জালিয়াতির সন্দেহ এবং একের পর এক তথ্যের অসঙ্গতি সামনে আসায় আদালত তাঁদের ‘সন্দেহের সুবিধা’ (Benefit of Doubt) দিয়ে অবিলম্বে জেল থেকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৯ সালের ২৫ আগস্ট, মধ্যপ্রদেশের দামোহ জেলায়। পেয়ারেলাল গড়রিয়া নামে এক ব্যক্তিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ এই খুনের দায় চাপায় তুলসীরাম ও হরপ্রসাদের ওপর এবং তাঁদের গ্রেফতার করে। ২০১২ সালে দামোহের নিম্ন আদালত (সেশন কোর্ট) প্রমাণের অভাব থাকা সত্ত্বেও তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। নিম্ন আদালতের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দুই ভাই আইনজীবী অজয় কুমার জৈনের মাধ্যমে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন।

হাই কোর্টের তদন্তে উঠে এল পুলিশের একাধিক গুরুতর গলদ

মামলাটির শুনানির সময় বিচারপতি বিবেক আগরওয়াল এবং বিচারপতি অবনীন্দ্র কুমার সিংয়ের ডিভিশন বেঞ্চ পুলিশি তদন্তের ফাঁকফোকর ও কারচুপি উন্মোচন করেন:

  • রহস্যময় এফআইআর (FIR): আদালতে খোদ তদন্তকারী অফিসারও জানাতে পারেননি যে মূল এফআইআর কে তৈরি করেছিলেন! এমনকি যে পুলিশকর্মী এফআইআরটি নথিভুক্ত করেছিলেন, তাঁকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে হাজিরই করা হয়নি।
  • সই বনাম টিপছাপের রহস্য: নিহতের পরিবারের মতে, পেয়ারেলাল সই করতে জানতেন। অথচ এফআইআর-এ তাঁর টিপছাপ ছিল! আদালতের চরম সন্দেহ—মৃত্যুর পর পুলিশ হয়তো নিহতের আঙুলের টিপছাপ ব্যবহার করে ভুয়ো নথিপত্র তৈরি করেছিল।
  • জবানবন্দিতে আকাশ-পাতাল তফাত: নিহতের স্ত্রী দাবি করেন, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ও তাঁর স্বামী বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তাঁদের ছেলে জানান, থানা থেকে বেরিয়েই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান, পেয়ারেলালকে হাসপাতালে মৃত অবস্থাতেই আনা হয়েছিল।
  • রক্তহীন ‘খুনের অস্ত্র’: পুলিশ যে ছুরিটিকে খুনের প্রধান অস্ত্র বলে আদালতে পেশ করেছিল, ফরেনসিক পরীক্ষায় তাতে এক ফোঁটা রক্তের অস্তিত্বও মেলেনি।
  • সাক্ষ্য গ্রহণে অনহেলা: কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সাক্ষীদের বয়ান নিতে পুলিশ ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত অনাবশ্যক সময় নষ্ট করেছিল।

আদালতের ঐতিহাসিক রায়

পুলিশ ও প্রসিকিউশনের সাজানো তথ্যে ভরপুর এই চরম গাফিলতি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাই কোর্ট। বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণে প্রসিকিউশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আদালতের এই নির্দেশে দীর্ঘ ১৭ বছর পর দুই ভাইয়ের নাম থেকে সাজানো খুনের কলঙ্ক মুছে গেল এবং তাঁরা আবার মুক্ত আকাশে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *