প্রাকৃতিক দুর্যোগেও অনড় হিমাচলের ‘কাঠ কুনি’! জানুন এই হাজার বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের রহস্য – এবেলা

প্রাকৃতিক দুর্যোগেও অনড় হিমাচলের ‘কাঠ কুনি’! জানুন এই হাজার বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের রহস্য – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

সম্প্রতি প্রতিবেশী নেপালে ভয়াবহ বন্যায় আধুনিক একাধিক বহুতল এবং রাস্তাঘাট ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। এই ধ্বংসলীলার মাঝেই ভারতের হিমাচল প্রদেশের কিছু বিশেষ ঐতিহ্যবাহী বাড়ির গঠনশৈলী ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। হিমাচলে বর্ষাকালে মেঘভাঙা বৃষ্টি, হড়পা বান ও ধস অতি সাধারণ ঘটনা। ২০২৪ সালের জুনাগড় থেকে অগস্টের প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজ্যের বহু আধুনিক সেতু, রাস্তা ও পাকা বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নজর কেড়েছিল সেখানকার শতাব্দী প্রাচীন কিছু বাড়ি, যা বিপর্যয়ের মুখেও অনড় দাঁড়িয়ে ছিল।

কী এই ‘কাঠ কুনি’ ও ‘ধাজ্জি দেওয়ারি’ কৌশল?

হিমাচলের পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে চাম্বায় প্রচলিত এই বিশেষ নির্মাণশৈলী তৈরি হয় কাঠ, পাথর ও মাটি দিয়ে।

  • কাঠ কুনি (Kath Kuni): এই পদ্ধতিতে অনুভূমিকভাবে (Horizontal) কাঠের মোটা বিম সাজিয়ে একটি শক্তিশালী ফ্রেম বানানো হয় এবং তার মাঝে ফাঁক না রেখে ভারী পাথর বসিয়ে দেওয়া হয়। কাঠের এই বিশেষ সংযোগকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘মানভি’ (Maanvi)।
  • ধাজ্জি দেওয়ারি (Dhajji Dewari): প্রধানত কাংড়া উপত্যকায় প্রচলিত এই পদ্ধতিতে কাঠের একটি মূল কাঠামোর (Frame) ভেতর ছোট ছোট পাথর ও মাটি ভরাট করে দেওয়াল তৈরি করা হয়।

কেন এই বাড়িগুলি ভূমিকম্প ও বন্যায় ভাঙ পড়ে না?

১. নমনীয়তা ও ফ্লেক্সিবিলিটি: আধুনিক সিমেন্টের বাড়ি অত্যন্ত অনমনীয় (Rigid) হওয়ায় ভূমিকম্পের কম্পনে সহজেই ভেঙে পড়ে। কিন্তু ‘কাঠ কুনি’ স্থাপত্যে কাঠ ও পাথরের এই ফ্লেক্সিবল কাঠামোর কারণে ভূমিকম্প বা প্রবল চাপে বাড়িটি সামান্য দুললেও পুরো কাঠামো ধসে পড়ে না। সর্বোচ্চ কিছু ছোট ফাটল দেখা দিতে পারে।

২. শক্তিশালী ভিত ও ঢালু ছাদ: জল ও তুষারপাত থেকে রক্ষা পেতে মাটির নিচে গর্ত করে আলগা পাথর দিয়ে একটি উঁচু শক্ত ভিত (Plinth) তৈরি করা হয়, যা জলকে সরাসরি ভিতের ক্ষতি করতে দেয় না। পাশাপাশি ঢালু ছাদ থাকার কারণে জল ও বরফ সহজে গড়িয়ে নিচে নেমে যায়।

৩. প্রাকৃতিক তাপ নিয়ন্ত্রণ: পুরু কাঠ ও পাথরের দেওয়াল শীতের সময়ে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা গরম রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মাটিতে তৈরি প্রলেপ ঘরে বায়ু চলাচলে সহায়তা করে।

তবে কেবল স্থাপত্য প্রকৌশলই নয়, কোনো দুর্যোগে বাড়ি টিকে থাকবে কি না তা অনেকটাই নির্ভর করে বাড়িটি কত দূরে এবং কী ধরনের ভৌগোলিক স্থানে নির্মিত হয়েছে তার ওপর। তা সত্ত্বেও প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি এই প্রাচীন ‘কাঠ কুনি’ ও ‘ধাজ্জি দেওয়ারি’ কৌশল আজও আধুনিক স্থাপত্য বিজ্ঞানের কাছে এক পরম বিস্ময়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *