শ্যাওলা থেকে নোবেলের মঞ্চ: চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ গবেষণায় ভারতীয় বিজ্ঞানী সুনীল কাটারিয়া – এবেলা

শ্যাওলা থেকে নোবেলের মঞ্চ: চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ গবেষণায় ভারতীয় বিজ্ঞানী সুনীল কাটারিয়া – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

পুকুরের জলে ভেসে বেড়ানো একবিন্দু সবুজ শ্যাওলা। না আছে তার মস্তিষ্ক, না আছে স্নায়ুতন্ত্র! তবুও সূর্যের আলো দেখলেই সে চিনে নেয় এবং দিব্যি আলোর দিকে সাঁতরে চলে। একটি এককোষী অণুবীক্ষণিক জীব কীভাবে আলো দেখতে পায়?

২০০১ সালে জার্মানির রেগেনসবার্গ বিশ্ববিদ্যায়ালের গবেষণাগারে এই অদ্ভুত প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছিলেন তৎকালীন পিএইচডি গবেষক ও বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) অধ্যাপক সুনীল কাটারিয়া। শ্যাওলার জিন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি পেয়ে যান বিজ্ঞানের এক অমূল্য রত্ন—দুটি বিশেষ জিন, যা আলো অনুধাবনকারী প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম। পরবর্তীতে এই প্রোটিনের নাম দেওয়া হয় ‘চ্যানেলরোডপসিন’ (Channelrhodopsin)।

সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ২৫ বছর পর, আলো দিয়ে মস্তিষ্কের নিউরন নিয়ন্ত্রণের বিশেষ প্রযুক্তি ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ (Optogenetics) উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান এবং জর্জ নাগেল। বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত এই নোবেলজয়ী গবেষণার মূল দুটি গবেষণাপত্রের সহ-লেখক ছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী সুনীল কাটারিয়া।

কীভাবে কাজ করে এই বিস্ময়কর প্রযুক্তি? আমাদের মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। চ্যানেলরোডপসিন প্রোটিনটি নিউরনের গায়ে একটি অতিসূক্ষ্ম দরজার মতো কাজ করে। এর ওপর আলো ফেললেই দরজাটি খুলে যায় এবং কোষে বৈদ্যুতিক পরিবর্তন ঘটে।

বিজ্ঞানীরা কোনো নির্দিষ্ট নিউরনে এই প্রোটিন তৈরি করে বাইরে থেকে আলো ফেলার মাধ্যমে শুধু সেই বিশেষ কোষটিকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করতে পারেন। ঐতিহ্যগত ওষুধ বা ইলেকট্রোড ব্যবহারের তুলনায় অপ্টোজেনেটিক্স প্রযুক্তি অনেক বেশি নির্দিষ্ট ও নির্ভুলভাবে কাজ করতে সক্ষম।

স্মৃতি ও মস্তিষ্কের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত ২০১২ সালে ইঁদুরের ওপর করা একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট নিউরনে আলো ফেলে ইঁদুরের ভয়ের স্মৃতিকে সক্রিয় করে তোলা সম্ভব। তবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি প্রয়োগ করা এখনো বেশ জটিল। মস্তিষ্কের গভীরে আলো পৌঁছানো এবং সঠিক নিউরনকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৃষ্টিশক্তি ফেরানো ও চোখের চিকিৎসার গবেষণা জোরকদমে চলছে। ভারতের আইআইটি মাদ্রাজ এবং বিটস পিলানির মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানেও অপ্টোজেনেটিক্স নিয়ে কাজ হচ্ছে। অন্যদিকে, জেএনইউ-র অধ্যাপক সুনীল কাটারিয়া বর্তমানে ‘সিলিয়োপ্যাথি’ (কোষের ক্ষুদ্র সিলিয়া সংক্রান্ত ব্যাধি) নিয়ে নতুন গবেষণায় ব্যস্ত।

এক অতিসূক্ষ্ম শৈবালের আলো চেনার কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ আন্তর্জাতিক নোবেলের মঞ্চে স্বীকৃত। অদূর ভবিষ্যতে এই আলোক-প্রযুক্তি যে কঠিন দূরারোগ্য মস্তিষ্কের ব্যাধি চিকিৎসায় বিপ্লব আনবে, সেই আশা জাগাচ্ছে বিজ্ঞানীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *