বিশাল আয়ের খবর জেনে বিদ্যাসাগরের কাছে মা চাইলেন মাত্র ৩টি গয়না, তারপর কী ঘটল?

বিদ্যাসাগরের জনকল্যাণমূলক দর্শনের নেপথ্যে মা ভগবতী দেবীর প্রভাব ও তাঁর অর্থনৈতিক জীবনচর্চা
নিজস্ব প্রতিবেদক: উনিশ শতকের নবজাগরণের অন্যতম কারিগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন ও দর্শনের ওপর তাঁর মা ভগবতী দেবীর প্রভাব ছিল অপরিসীম। সম্প্রতি ‘সংস্কৃতি বিচিত্রা’ নামক একটি ইউটিউব পডকাস্টে বিদ্যাসাগরের বংশধর অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় এক আলোচনায় তুলে ধরেছেন যে, বিদ্যাসাগরের নারীকল্যাণমূলক চিন্তাভাবনার মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল তাঁর মায়ের আদর্শ থেকেই।
বীরসিংহ গ্রামের ভগবতী দেবী কেবল বিদ্যাসাগরের জননী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন উদার মানসিকতাসম্পন্ন এক মহিয়সী নারী। বিদ্যাসাগর তাঁর মায়ের সম্মানে যে স্কুল ও গ্রামীণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও জনসেবার উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে রয়েছে। বিদ্যাসাগরের মেজো মেয়ে কুমুদিনী দেবীর বংশধর অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ঈশ্বরচন্দ্রের জনকল্যাণকামী সত্তার বিকাশ ঘটেছিল মূলত মায়ের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণায়।
বিদ্যাসাগরের কর্মজীবন ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিয়েও আলোচনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যাসাগর তৎকালীন সময়ের নিরিখে অত্যন্ত উচ্চমানের বেতনভুক্ত ছিলেন। ১৮৫১ সাল থেকে সাত বছর তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় যখন এক ভরি সোনার দাম ছিল মাত্র ১৬ টাকা, তখন বিদ্যাসাগরের মাসিক বেতন ছিল কয়েকশো টাকা। এ ছাড়াও নিজের প্রকাশনা সংস্থা ও বইয়ের ব্যবসা থেকে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন।
অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বিদ্যাসাগরের অর্জিত এই বিপুল অর্থব্যয়ের প্রধান ক্ষেত্র ছিল জনসেবা ও দানধ্যান। আজীবন আপসহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিদ্যাসাগর তাঁর আয়ের সিংহভাগই ব্যয় করেছেন আর্তমানবতার সেবায়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভাষায়, বিদ্যাসাগরের মধ্যে ছিল প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি এবং বাঙালি মায়ের কোমল হৃদয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় ভগবতী দেবীর প্রগতিশীল চিন্তাধারা ঈশ্বরচন্দ্রকে একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্ম নিয়ে বর্তমানে যে বিস্মরণের পর্দা পড়ার অভিযোগ উঠছে, তা সরাতেই বংশধররা তাঁর অবদানকে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তথ্যসূত্র অনুযায়ী, করুনা সাগর বিদ্যাসাগর ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ উপন্যাসের মতো ঐতিহাসিক দলিলগুলোতেও বিদ্যাসাগরের জীবনবোধের এই বহুমুখী রূপের কথা বর্ণিত হয়েছে।
