আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের তাণ্ডব, ফোনের ওপারে কান্নার রোল এক কোটি প্রবাসীর ঘুম কেড়ে নিল – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
পশ্চিম এশিয়ায় ঘনিয়ে আসা যুদ্ধের কালো মেঘ এখন এক কোটি ভারতীয় প্রবাসীর জীবনে অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে। ইরান, ইজরায়েল এবং আমেরিকার ত্রিমুখী সংঘাতে উত্তাল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। মাথার ওপর দিয়ে ধেয়ে যাচ্ছে একের পর এক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, আর পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটি প্রতি মুহূর্তে সজাগ করে দিচ্ছে মৃত্যুসংবাদ বা সতর্কবার্তায়। ঘরবন্দি ভারতীয়রা এখন শুধু প্রহর গুনছেন, কখন থামবে এই বারুদের আস্ফালন।
আতঙ্কের প্রহর গুনছে গালফ দেশগুলো এবং উদ্বিগ্ন পরিবার
সংযুক্ত আরব আমিরশাহী থেকে বাহরিন, সবখানেই এখন ড্রোন আর মিসাইলের কানফাটানো শব্দ। কর্নাটকের দক্ষিণ কন্নড় জেলার আসিয়া বিবির মতো হাজারো মা এখন দুশ্চিন্তায় দিশেহারা। তাঁর দুই ছেলে আবু ধাবি ও বাহরিনে কর্মরত। আসিয়া জানান, যতক্ষণ না ছেলেদের গলার স্বর ফোনে শুনতে পাচ্ছেন, ততক্ষণ এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি নেই। জীবন আর জীবিকার টানে মরুশহরে পাড়ি দেওয়া এই লক্ষ লক্ষ ভারতীয়র কাছে বর্তমান পরিস্থিতি এক দুঃস্বপ্নের মতো।
দুবাই থেকে মানামা যেখানেই চোখ যায় শুধু ধ্বংসাবশেষ
দুবাইয়ের নামী শিল্পপতি ও সমাজসেবী এস পি সিং ওবেরয় জানিয়েছেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা আসাম্ভব। খোলা আকাশে ড্রোনের মহড়া আর সেগুলোকে মাঝপথে ধ্বংস করার সময় ওপর থেকে আছড়ে পড়ছে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো পড়ে অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। প্রশাসন থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কেউ অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হন। জিপিএস এবং রাডার ব্যবস্থার গোলযোগের কারণে বিমান পরিষেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
পরিসংখ্যানে ভারতীয়দের অবস্থান
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র জিসিসি (GCC) দেশগুলোতেই ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯০ লক্ষ ভারতীয়র বসবাস। যার সিংহভাগ রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও সৌদি আরবে। এছাড়াও ইজরায়েলে প্রায় এক লক্ষ এবং ইরানে দশ হাজার ভারতীয় এই মুহূর্তে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন। যুদ্ধের আঁচ লাগায় দুবাই, আবু ধাবি ও দোহার মতো ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলো কার্যত এখন ভূতুড়ে এলাকায় পরিণত হয়েছে। বাতিল হয়েছে হাজারেরও বেশি ফ্লাইট, যার ফলে বিমানবন্দরেই আটকে পড়েছেন প্রায় ৯০ হাজার যাত্রী।
ভুয়ো খবর ও সাইরেনের শব্দে কাটছে বিনিদ্র রজনী
দুবাইয়ে কর্মরত বদরুদ্দিন আজমান জানিয়েছেন, যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুয়ো খবর। হোয়াটসঅ্যাপে আসা ভুল তথ্যে ভারতে থাকা আত্মীয়রা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে, আবু ধাবিতে থাকা মহম্মদ আদম ও আকবর আলিরা জানান, মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চলায় সারা রাত সাইরেনের আওয়াজে কান পাতা দায় হয়ে পড়েছিল। ৪ মার্চ পর্যন্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস করানোর নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
অচল জনজীবন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বাহরিনের রাজধানী মানামায় পরিস্থিতি আরও জটিল। কেরলের এক প্রবাসী ব্যবসায়ী জানান, জুফাইর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার পর গোটা এলাকা সিল করে দেওয়া হয়েছে। সরকার সাধারণ মানুষকে নিরাপদ বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। দোকানপাট আংশিক খোলা থাকলেও খাদ্যদ্রব্যের জোগান নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছে। বেঙ্গালুরু থেকে দুবাই ফেরার অপেক্ষায় থাকা দীনদয়াল শেট্টির মতো শত শত ভারতীয় এখন অনিশ্চয়তার সাগরে ভাসছেন। আকাশপথ বন্ধ থাকায় তাঁরা না পারছেন প্রিয়জনের কাছে ফিরতে, না পারছেন কর্মস্থলে যোগ দিতে।
যুদ্ধের এই লেলিহান শিখা কবে নিভবে তা কেউ জানে না, তবে এক কোটি ভারতীয়র জীবন এখন স্রেফ প্রার্থনা আর ভাগ্যের ওপর ঝুলে রয়েছে।

