আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব সামলাতে ‘থ্রি এফ’-এ বিশেষ নজরদারির বার্তা অর্থমন্ত্রীর, হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন উদ্বেগ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা লাগাতার যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অশান্তির আঁচ এবার সরাসরি এসে পড়তে শুরু করেছে ভারতের অর্থনীতিতেও। এই চরম আন্তর্জাতিক সংকটের আবহে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্র সরকার অত্যন্ত সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সোমবার এক অনুষ্ঠানে নিশ্চিত করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তিনি স্পষ্ট জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতকে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে— জ্বালানি (Fuel), সার (Fertiliser) এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার (Foreign Exchange Reserves বা Forex)। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় এই ‘থ্রি এফ’ (3F) ক্ষেত্রই এখন দেশের অর্থনীতির প্রধান নজরদারি বিন্দু।
সারের ‘কল্পনাতীত’ দাম ও জ্বালানির বাজারে আগুন
অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে “কল্পনাতীত” বলে বর্ণনা করেছেন, যা দেশের কৃষি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি দেশের বাজারে পেট্রল ও ডিজেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি এবং লাগাতার সোনার দাম বাড়ার ফলেও আমদানি খরচ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর বিপুল চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মে থেকে ২৫ মে-র মধ্যে দেশের বাজারে পেট্রলের দাম লিটার প্রতি মোট প্রায় ৭ টাকা ৩৫ পয়সা এবং ডিজেলের দাম প্রায়7 টাকা ৫৩ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবারও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারে যথাক্রমে ২ টাকা ৬১ পয়সা এবং ২ টাকা ৭১ পয়সা বাড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ
ভারতের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিম এশিয়ার ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। উল্লেখ্য, এই জলপথটি দিয়েই ভারতের প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়। যদি এই পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে ভারতের জ্বালানি ও কৃষিক্ষেত্রে সরবরাহের চেইন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়ানো, বিশেষ করে অতিরিক্ত সোনা কেনা বা বিদেশ ভ্রমণের মতো ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাশ টানার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রের পদক্ষেপ ও নেতিবাচক প্রচারের জবাব
বিশ্ববাজারের এই দ্বিমুখী চাপ সামলাতে কেন্দ্র সরকার বেশ কিছু পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী:
- আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে শুল্ক হ্রাস: আমজনতাকে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের আগুন থেকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পেট্রল ও ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক (Excise Duty) কমিয়েছে কেন্দ্র। এর ফলে সরকারের প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে।
- ক্ষুদ্র শিল্পের বকেয়া মেটানোর কড়া নির্দেশ: দেশের ক্ষুদ্র, ছোট এবং মাঝারি শিল্প (MSME) সংস্থাগুলির প্রায় ৮ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আটকে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন নির্মলা সীতারামন। তিনি সমস্ত সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে কড়া নির্দেশ দিয়ে জানান, নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে এই সমস্ত ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থাগুলির বকেয়া পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে, যাতে বাজারে অর্থের জোগান সচল থাকে।
ভয়ের পরিবেশ তৈরির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা
দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে বলে বিরোধীদের নেতিবাচক প্রচারের কড়া সমালোচনা করেন অর্থমন্ত্রী। কারও নাম না করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল। দেশে ক্রমাগত জিএসটি সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের চাহিদা বজায় থাকাকে এর বড় প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি দেশবাসীকে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকার আহ্বান জানান।
এক ঝলকে
- পশ্চিম এশিয়ার সংকটের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখতে ‘থ্রি এফ’— ফুয়েল (Fuel), ফার্টিলাইজার (Fertiliser) ও ফরেক্স (Forex)-এর ওপর কড়া নজরদারির নির্দেশ অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের।
- হরমুজ প্রণালী বন্ধের আশঙ্কায় তেল ও সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার বড় উদ্বেগ; গত ১০ দিনে পেট্রলের দাম লিটার প্রতি প্রায় ৭.৩৫ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৭.৫৩ টাকা বৃদ্ধি।
- সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে জ্বালানি তেলের ওপর আবগারি শুল্ক কমিয়েছে কেন্দ্র, যার ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (MSME) সুবিধার্থে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আটকে থাকা ৮.১ লক্ষ কোটি টাকার বকেয়া পাওনা ৪৫ দিনের মধ্যে মেটানোর জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে কড়া বার্তা।
