লেটেস্ট নিউজ

আরটিআই আইনের ডানা ছাঁটার ছক? কেন্দ্রের নতুন পদক্ষেপে তুঙ্গে বিতর্ক – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

নয়াদিল্লি: ফেলুদার সেই বিখ্যাত সংলাপ মনে আছে? “কোনো প্রশ্ন নয়!” জটায়ুর অতি-কৌতূহলে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন প্রদোষচন্দ্র মিত্র। ঠিক একই কায়দায় এবার দেশের আমজনতার তথ্য জানার অধিকারে তর্জনি সেঁটে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে মোদি সরকার। ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই (RTI) নিয়ে যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠছে, প্রশাসনের স্বচ্ছতা বজায় রাখার বদলে গোপনীয়তার মোড়কে দুর্নীতি আড়াল করার পথ খুঁজছে কেন্দ্র।

‘অহেতুক কৌতূহলে’ রাশ টানার প্রস্তাব

সদ্য পেশ করা অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, ২০০৫ সালের এই ঐতিহাসিক আইনটি এখন প্রশাসনিক কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট কিছু গোপন নথি এবং সরকারি আধিকারিকদের অভ্যন্তরীণ আলোচনার খসড়া আরটিআই-এর আওতার বাইরে রাখা প্রয়োজন। যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই সব তথ্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে সরকারি কর্তারা খোলামেলা মতামত দিতে দ্বিধাবোধ করছেন। অর্থাৎ, ‘প্রশাসনিক স্বার্থে’ এখন নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারে কাঁচি চালাতে চাইছে সরকার।

খাড়্গের তোপ: আরটিআই খুনের নীল নকশা?

এই সুপারিশ সামনে আসতেই রণংদেহি মেজাজে কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, মোদি সরকার সুপরিকল্পিতভাবে আরটিআই আইনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তাঁর মতে, আগে মনরেগা প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে তাকে দুর্বল করা হয়েছে, আর এখন দুর্নীতির তথ্য ধামাচাপা দিতে আরটিআই-কে নিশানায় নেওয়া হয়েছে।

এক্স হ্যান্ডলে ক্ষোভ উগরে দিয়ে খাড়্গে জানান:

  • গত এক বছরে ২৬ হাজারেরও বেশি আরটিআই আবেদনের কোনো সদুত্তর মেলেনি।
  • বিগত ১১ বছরে এই নিয়ে সপ্তমবারের মতো মুখ্য তথ্য কমিশনারের পদ শূন্য রাখা হয়েছে।
  • ২০২৩ সালের ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

গোপনীয়তা বনাম স্বচ্ছতা

ইউপিএ জমানায় ২০০৫ সালে যখন এই আইন চালু হয়, মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি কাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সরকারের আর্থিক সমীক্ষার দাবি, এই আইন এখন ‘অহেতুক কৌতূহল’ মেটানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সরকারের প্রস্তাব—প্রকল্প চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার আগে কোনো অন্তর্বর্তী তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এমনকি মন্ত্রীদের হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তুলে দেওয়ার ইঙ্গিতও মিলেছে।

বিরোধীদের দাবি, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কোনো প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। এখন তথ্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে জবাবদিহিতা এড়ানোর চূড়ান্ত চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, তথ্য অধিকার কর্মীদের উপর বাড়ছে আক্রমণ। খাড়্গের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে শ’খানেক আরটিআই কর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

সব মিলিয়ে, তথ্যের অধিকার আইন সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার এই সরকারি উদ্যোগকে ঘিরে সংসদের অন্দরে এবং বাইরে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ আদৌ আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন কি না, এখন সেটাই সবথেকে বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *