কলকাতায় বিপজ্জনক কম্বিনেশনে ঘাতক ‘হাই হিট ইনডেক্স’, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাঁচতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ – এবেলা

কলকাতায় বিপজ্জনক কম্বিনেশনে ঘাতক ‘হাই হিট ইনডেক্স’, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাঁচতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় তাপমাত্রার পারদ ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে থাকলেও বাতাসের মারাত্মক আর্দ্রতা পরিস্থিতিকে করে তুলেছে চরম বিপজ্জনক। চিকিৎসকদের মতে, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ৬৩ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলায় ঘাম সহজে শুকোচ্ছে না। ফলে শরীরের নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বা কুলিং সিস্টেম পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হচ্ছে ‘হাই হিট ইনডেক্স’। এর জেরে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে গরমের অনুভূতি বা ‘রিয়েল ফিল’ প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ ডিগ্রির মতো লাগছে, যা মানবদেহের জন্য এক প্রকার যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সামান্য অসাবধানতা এখানে বড়সড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

অঙ্গ বিকল থেকে পেটের রোগ, ওত পেতে রয়েছে পাঁচ বিপদ

তীব্র এই দাবদাহে মানবশরীরে মূলত পাঁচ ধরনের বড় রোগ ও শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ‘হিটস্ট্রোক’। সরাসরি দীর্ঘক্ষণ কড়া রোদে থাকলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। ফলে শরীরের কোশে থাকা প্রোটিনগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রোটিন কোয়াগুলেশন’ বলা হয়। এর জেরে হার্ট, মস্তিষ্কসহ প্রতিটি অঙ্গ দ্রুত বিকল হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। শিশু, বয়স্ক ও কোমর্বিডিটি থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

এ ছাড়া হিটস্ট্রোকের আগের ধাপ হিসেবে অতিরিক্ত ঘামে শরীর নিস্তেজ হয়ে ‘হিট এক্সজশন’ দেখা দিতে পারে। নুন ও জলের ঘাটতিতে হাত-পায়ের পেশিতে তীব্র টান বা ‘হিট ক্র্যাম্পস’ হতে পারে। শরীরে জলের অভাবে রক্তচাপ কমে গিয়ে প্রস্রাবে জ্বালাভাব এবং কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ায় ফুড পয়জনিং, ডায়রিয়া, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো জলবাহিত সংক্রমণের প্রকোপও বহুলাংশে বেড়ে যায়।

সুস্থ থাকতে যা করবেন এবং যা বর্জন করবেন

এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে চিকিৎসকরা বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছেন। রোদের তীব্রতা এড়াতে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত খুব জরুরি কাজ না থাকলে সরাসরি রোদে বের হওয়া যাবে না। তেষ্টা না পেলেও প্রতি ২০-৩০ মিনিট অন্তর জল, ওআরএস (ORS), লেবুর জল বা ডাবের জল খেতে হবে, যা শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের ঘাটতি মেটাবে। পোশাকের ক্ষেত্রে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা সুতির কাপড় বেছে নিতে হবে এবং বাইরে বেরোলে ছাতা, চওড়া টুপি ও রোদচশমা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। খাবারের তালিকায় রাখতে হবে লাউ, পেঁপে, শসা বা তরমুজের মতো সহজপাচ্য জলীয় খাবার।

পাশাপাশি কিছু ভুল অভ্যাস এই সময়ে মারাত্মক প্রমাণিত হতে পারে। প্রচণ্ড ঠান্ডা এসি ঘর বা গাড়ি থেকে নেমেই আচমকা কড়া রোদে যাওয়া কিংবা রোদ থেকে ফিরেই ফ্রিজের কনকনে ঠান্ডা জল খাওয়া বা স্নান করা একেবারেই চলবে না। এই আচমকা তাপমাত্রার পরিবর্তন বা ‘থার্মাল শক’ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। চা, কফি বা অ্যালকোহল শরীরকে আরও শুষ্ক করে দেয় বলে এগুলো বর্জন করাই শ্রেয়। সংক্রমণ এড়াতে রাস্তার ধারের কাটা ফল, লস্যি বা বরফ দেওয়া জল খাওয়া থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে।

উচ্চ ঝুঁকিতে যাঁরা এবং জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা

এই আবহাওয়ায় শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী মহিলা এবং ডায়াবেটিস বা কিডনির মতো ক্রনিক রোগীদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। ট্রাফিক পুলিশ, ডেলিভারি বয় বা নির্মাণ শ্রমিকদের মতো যাঁরা বাইরে কাজ করেন, তাঁদের প্রতি এক ঘণ্টায় অন্তত ১৫ মিনিট ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া ও ওআরএস জল খাওয়া জরুরি।

যদি কোনো ব্যক্তি আচমকা রাস্তায় বা বাড়িতে গরমে অসুস্থ হয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যান, তবে তৎক্ষণাৎ তাঁকে রোদ থেকে সরিয়ে কোনো ঠান্ডা বা ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে যেতে হবে। গায়ের টাইট পোশাক ঢিলে করে দিয়ে, ভিজে কাপড় দিয়ে সারা শরীর বারবার মুছিয়ে (স্পঞ্জিং) শরীরের তাপমাত্রা কমানোর প্রাথমিক চেষ্টা করতে হবে। অবস্থার দ্রুত উন্নতি না হলে রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *